সর্বত্র মানুষ আর মানুষ

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৯

রাজবংশী রায়

সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সর্বশেষ ৪০তম বিসিএস পরীক্ষার জন্য আবেদন করেন সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী। এর বিপরীতে শূন্য পদের সংখ্যা ১ হাজার ৯০৩টি। অর্থাৎ একটি পদের বিপরীতে প্রতিযোগী প্রায় ২৩৭ জন। শুধু বিসিএস নয়, সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানেই নির্ধারিত পদের বিপরীতে চাকরিপ্রার্থীর অজস্র আবেদনপত্র। বাড়ছে বেকারত্ব। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বাস-লঞ্চ-ট্রেন সর্বত্রই উপচেপড়া ভিড়। টাকা তুলতে ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনেও দীর্ঘ লাইন। যানজটে স্থবির হয়ে পড়ছে নগরজীবন। এই চিত্র এখন রাজধানী পেরিয়ে বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাড়ি-গাড়ি। কমছে আবাদি কৃষি ও ফসলি জমি। সারাদেশের মধ্যে ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ সবচেয়ে বেশি। মোট জনগোষ্ঠীর এক দশমাংশের বাস রাজধানী ঢাকায়। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কর্মচঞ্চল হয়ে থাকে ঢাকা। যে হারে মানুষ বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না নাগরিক সুবিধা। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যানজটের সমস্যা প্রকট হচ্ছে দিন দিন। এসবের বৃদ্ধি ঘটছে অপরিকল্পিতভাবে। ছোট্ট আয়তনের এই বাংলাদেশ ১৭ কোটি মানুষ নিয়ে বিশ্বের মধ্যে অষ্টম। এর ওপরে গত ৯ বছর ধরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার একই স্থানে। প্রতি বছর ২৩ লাখ মানুষ নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। এর বিপরীতে প্রতি হাজারে মৃত্যু হচ্ছে ৫ জনের। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২০ কোটি ২০ লাখ।

বাংলাদেশ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ সইবে কীভাবে- এমন প্রশ্ন সংশ্নিষ্টদের। তাদের অভিমত, জনসংখ্যা বৃদ্ধি যে হারে ঘটছে, তাতে একরকম টাইমবোমার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। এখনই লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ভবিষ্যতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এ জন্য সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম নূর-উন-নবী বলেন, 'জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সত্তর কিংবা আশির দশকে যেসব কৌশল প্রয়োগ ও বক্তব্য দিয়ে মানুষকে সচেতন করা হয়েছে, তা এখন চলবে না। কারণ দীর্ঘ সময়ে মানুষের চিন্তা, চেতনা, রুচিবোধের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তাই কর্মসূচিও নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট এলাকার, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী এবং নির্দিষ্ট বয়সী মানুষদের টার্গেট করে কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। তাহলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির যেসব সূচক ঝিমিয়ে পড়েছে, সেগুলোতে গতির সঞ্চার হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।'

এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- 'জনসংখ্যা ও উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ২৫ বছর : প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন'। দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মানুষ যেভাবে বাড়ছে :আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের তিন হাজার ভাগের এক ভাগ মাত্র। কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে রয়েছে অষ্টম স্থানে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের ১ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪০ লাখ ৬০ হাজার বলে জানানো হয়েছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১০ লাখ। তখন প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল ১ হাজার ২৮৮ জন। স্বাধীনতার পর ৪৯ বছরে সেই জনসংখ্যা আড়াই গুণ বেড়ে ১৭ কোটি ছুঁইছুঁই করছে। প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যার ঘনত্ব তিন হাজারের ওপরে। একাত্তরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০১১ সালে তা কমে ১ দশমিক ৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গত ৯ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার স্থির হয়ে আছে। তবুও প্রতি বছর মোট

জনসংখ্যার সঙ্গে ২৩ লাখ মানুষ নতুন করে যুক্ত হচ্ছে।

ঢাকায় উপচেপড়া ভিড় :তিনটি আদমশুমারির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৬৪ লাখ ৮৭ হাজার। ১০ বছর পর ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সেই জনসংখ্যা বেড়ে ৯৬ লাখ ৭৩ হাজারে দাঁড়ায়। ২০১১ সালে সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী তা দাঁড়ায় এক কোটি ৪১ লাখ ৭২ হাজারে। বছরে ঢাকায় ৬ লাখ ২৯ হাজার করে মানুষ বাড়ছে। এ হিসাবে বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা এক কোটি ৯২ লাখ ৪ হাজারে পৌঁছানোর কথা।

ঢাকায় কেন এত মানুষ বাড়ছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, 'দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পাঞ্চল, তৈরি পোশাকশিল্পের ৭৫ শতাংশ ঢাকা ও এর আশপাশে। বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রও এই শহর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। দেশের অন্যান্য অঞ্চল বিশেষ করে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলো অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। এসব কারণ ঢাকাকে জনবহুল করে তুলেছে।'

নগরায়ণ ও শিল্পায়নের বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে এই নগরবিদ বলেন, জনসংখ্যার চাপের হাত থেকে ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে শিল্পকারখানা, উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। অন্যথায় জনসংখ্যার চাপে ঢাকার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

বিশ্ব পরিস্থিতি :জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ৭৭১ কোটি ৫০ লাখ। গত ৯ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ১ শতাংশ। গড় আয়ু ৭২ বছর। বিশ্বের ১০টি জনবহুল দেশের মধ্যে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ- এই পাঁচটি এশিয়ার দেশ। লাতিন আমেরিকার দুই দেশ ব্রাজিল ও মেক্সিকো, আফ্রিকার নাইজেরিয়া, উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের রুশ ফেডারেশন।

চীন ও ভারতে বিশ্বের ৩৭ শতাংশ মানুষ বাস করে। বর্তমানে চীনের জনসংখ্যা ১৪২ কোটি আর ভারতের ১৩৬ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার। চীনে প্রতিবছর ৭৪ লাখ মানুষ বাড়ছে। অন্যদিকে ভারতে প্রতিবছর ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ। ২০২৪ সালে দুই দেশেরই জনসংখ্যা হবে ১৪৪ কোটি করে।

তবে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অত্যন্ত কম। আয়তন, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকার পরও জনসংখ্যার বৃদ্ধি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করে তারা। তবে মধ্যপ্রাচ্যে উল্টো চিত্র। এ অঞ্চলের দেশগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি। ইতালি, জাপান, হাঙ্গেরি, ইউক্রেন, ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, পর্তুগাল, সার্বিয়াসহ অনেক দেশে জনসংখ্যা কমানো হচ্ছে এবং তারা মাইনাসে আছে।

লাগাম টানা যাচ্ছে না যে কারণে :জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে সরকারের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচি সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধি, পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদার হার হ্রাস, ড্রপআউট হার হ্রাস, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসসহ অন্যান্য সব সূচকে অগ্রগতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য হারে কমছে না। ২০১১ সালের পর থেকে এই সূচকটি একই জায়গায় থমকে আছে।

কর্মসূচি-সংশ্নিষ্টরা জানান, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও কর্মসূচি সম্পর্কে সচেতন নন। তাদের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এবং মোট প্রজনন হার বেশি। সারাদেশে মোট প্রজনন হার যেখানে ২ দশমিক ৩ জন, সেখানে চট্টগ্রামে ২ দশমিক ৫ জন এবং সিলেটে ২ দশমিক ৯ জন। তবে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে রংপুর ও খুলনা বিভাগ সফলতা অর্জন করেছে। এই দুই বিভাগেই মোট প্রজনন হার ১ দশমিক ৯ জন করে। রংপুরে ৭০ জন এবং খুলনায় ৬৭ জন দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেন। যথাক্রমে ৭ ও ৯ শতাংশ দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। এর পর মোট প্রজনন হার রাজশাহীতে ২ দশমিক ১ জন, বরিশালে ২ দশমিক ২ জন এবং ঢাকায় ২ দশমিক ৩ জন। রাজশাহীতে ৬৯ ভাগ, বরিশাল এবং ঢাকায় ৬৩ ভাগ দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেন। সারাদেশে এখনও ৩৭ ভাগের বেশি দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করছে না।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. কাজী মোস্তফা সারোয়ার বলেন, '২০২০ সালের মধ্যে মোট প্রজনন হার ২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ চলছে। কিন্তু ভৌগোলিক কারণ, হাওর ও পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় সেবা সঠিকভাবে পৌঁছানো যাচ্ছে না। একইসঙ্গে জনবল সংকটও রয়েছে। তবে সবকিছু কাটিয়ে জোরালো কার্যক্রম চালানো হবে।'

কর্মসূচির চ্যালেঞ্জ : পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য কার্যক্রমে সাফল্য অর্জনে সরকারের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসবের মধ্যে বাল্যবিয়ে হ্রাস, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের হার বৃদ্ধি করা, ড্রপআউটের হার হ্রাস, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাকর্মীর মাধ্যমে প্রসবের হার বৃদ্ধি, সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য হ্রাস, দুর্গম এলাকায় যথাযথভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়া অন্যতম। কারণ এখনও ৫৯ শতাংশ মেয়েকে ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের ৩১ শতাংশ মা হচ্ছেন এবং তাদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের হার মাত্র ৪৭ শতাংশ। সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চতুর্থ স্বাস্থ্য. জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) লক্ষ্যমাত্রা এবং ভিশন-২০২১ অর্জনের পথে সরকারকে এসব সূচকে উন্নতি ঘটাতে হবে। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়।

কর্মসূচি : দিবসটি উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, শোভযাত্রাসহ নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হবে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে।