পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ঠেকাতে মাঠে সাইবার পুলিশ

'ছেলেধরা' সন্দেহে গণপিটুনিতে যুবক নিহত

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৯

আতাউর রহমান

স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ ঠেকাতে শুরুতেই দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। এসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান হয়েছে। সেতু নির্মাণ আর নদীশাসন মিলিয়ে প্রকল্পের ৭১ ভাগ কাজ যখন শেষ, তখন আবার নতুন গুজব ছড়ানো শুরু হয়েছে। গুজব ছড়াতে ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেছে নেওয়া হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারী আর কুচক্রীরা গুজব ছড়াচ্ছে- 'পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ পরিচালনায় মানুষের কাটা মাথা লাগবে।' অবশ্য পদ্মা সেতু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে ওই গুজবের জোর প্রতিবাদ করে বলেছে, এর কোনো সত্যতা নেই। গুজব ঠেকাতে এবার মাঠে নেমেছে পুলিশ। ষড়যন্ত্রকারী আর চক্রান্তের শেকড় খুঁজছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। এরই মধ্যে পুলিশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় সাইবার টহল দেওয়া শুরু করেছে।

এমন গুজবের পর মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় 'ছেলেধরা' সন্দেহে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে জনতা। তবে গুজবে বিভ্রান্ত মানুষকে সচেতন করতে গতকাল বুধবার ওই এলাকায় মাইকিং করেছে পুলিশ। বলা হয়, পদ্মা সেতু ঘিরে গুজবের কোনো ভিত্তি নেই। এলাকায় অপরিচিত কাউকে দেখে

সন্দেহ হলে তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিন।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের ডিসি মো. আলিমুজ্জামান সমকালকে বলেন, গুজবের বিষয়টি নজরে আসার পর ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরই মধ্যে গুজব সৃষ্টিকারী কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ ও ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।

সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলা হয়েছে, 'পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ পরিচালনায় মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ রকম কিছু ব্যক্তিকে আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। এ ছাড়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, সিআইডি, পিবিআইসহ অন্যান্য সংস্থাও এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে। সুতরাং, এমন অপপ্রচার থেকে বিরত থাকুন এবং এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে কঠোরভাবে প্রতিবাদ করুন। নিকটস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করুন, দেশ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখুন।'

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, তাদের সাইবার সিকিউরিটি বিভাগও পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব সৃষ্টিকারীদের নজরদারি করছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তির ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপ থেকে এ ধরনের গুজব ছড়ানো হয়। ধীরে ধীরে তা ছড়াতে থাকে। সোমবার থেকে সক্রিয় হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। এরই মধ্যে ওই পোস্ট শেয়ার করেছেন এমন অন্তত ১০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন তরুণীও রয়েছেন। এ ছাড়া প্রাথমিকভাবে ১২টি ফেসবুক গ্রুপ শনাক্ত করা হয়েছে। গুজব ছড়ানো এসব গ্রুপে হাজার হাজার ফলোয়ার রয়েছে। অনেকে নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকেও ফটোশপ ও সুপার ইম্পোজ করে কাটা মাথার ছবি ছড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া লোকজনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট যাচাই করে দেখা গেছে, এরা বিভিন্ন সময়েই নানা গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়। আবার অনেকে না বুঝেই গুজব সংবলিত

পোস্ট শেয়ার দিয়েছেন।

এ গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে র?্যাবের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমরানুল হাসান বলেন, ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ করে মঙ্গলবার তারা এ ধরনের গুজবের বিষয়ে তথ্য পেয়েছেন। এরই মধ্যে গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

মোহাম্মদপুর থানার এসআই বুলবুল আহমেদ জানান, পদ্মা সেতু নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে চাঁদ উদ্যান এলাকায় বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষের অনেকেই নিজেদের সন্তানকে নিয়ে আতঙ্কিত। এর মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে অপরিচিত এক যুবক ওই এলাকার এক শিশুকে ডেকে কথা বলেন। দূর থেকে এ দৃশ্য দেখে সন্দেহ হয় অভিভাবকদের। তারা ধরেই নেন যুবকটি শিশুটিকে অপহরণের উদ্দেশ্যে এসেছে। মুহূর্তে তাকে ছেলেধরা আখ্যা দিয়ে মারধর শুরু হয়। কিল-ঘুষির পাশাপাশি ইট দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয় তার মাথা। আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী ওই যুবকের পরনে ছিল ট্রাউজার ও টি-শার্ট।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি জিজি বিশ্বাস বলেন, নিহত ওই যুবকের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। তার আঙুলের ছাপ দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে নিহত যুবক অপরাধী কি-না, তিনি কোন উদ্দেশ্যে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন- এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। এমনকি কোন শিশুর সঙ্গে তিনি কথা বলেছিলেন তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।