বেশি মুনাফার লোভে সরকারি গুদামে কালোবাজারির চাল

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৯

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

অধিক মুনাফা পেতে চট্টগ্রামে সরকারি খাদ্যগুদামে সরকারি চাল মজুদ করে রেখে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল কালোবাজারি। মিলেমিশে এ চাল কালোবাজারিতে জড়িত খাদ্য কর্মকর্তা, খাদ্য সমিতির কর্মকর্তা, আড়তদার ও চাল ব্যবসায়ীদের সাত সদস্যের সিন্ডিকেট। দিনদুপুরে প্রকাশ্যেই সরকারি গুদাম থেকে ট্রাকে করে পাচার হয়ে আসছিল সরকারি চাল। কিন্তু গুদামের সাধারণ ওজন স্কেল ও চেকপোস্টের রেজিস্টারে এন্টি হতো না ওই ট্রাকের নম্বর ও ঠিকানা! তদন্তে নেমে চট্টগ্রামের ৪০টি খাদ্য গোডাউনের মধ্যে তিনটি গোডাউনে ৬৪ টন হিসাববহির্ভূত অতিরিক্ত চাল এবং প্রচুর পরিমাণে ঝুরা চালের সন্ধান পায় পুলিশ। র‌্যাবের হাতে আটক সরকারি চাল চোরাচালানের একটি মামলার তদন্ত শেষে চট্টগ্রামের আদালতে পিবিআইর দাখিল করা চার্জশিটে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন আনোয়ার জানান, চট্টগ্রামের সরকারি খাদ্যগুদামের চাল কালোবাজারিতে জড়িত সাত চোরাচালানিকে অভিযুক্ত করে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটে অসাধু খাদ্য কর্মকর্তা, চাল ব্যবসায়ী ও পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্তদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। চার্জশিটে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি চাল কালোবাজারিতে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

পিবিআইর সরকারি চাল চোরাচালান মামলার চার্জশিটে অভিযুক্তরা হলেন- চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর সিএসডির ম্যানেজার প্রণয়ন চাকমা, চট্টগ্রাম বিভাগীয় খাদ্য পরিদর্শক সমিতির প্রধান মো. ফখরুল আলম মানিক, পাহাড়তলী খাজা ভাণ্ডার চালের আড়ত মালিক মো. সাহাবুদ্দিন মিয়া, চাল ব্যবসায়ী শামছুল হুদা প্রকাশ আবুল হোসেন, পরিবহন মালিক মো. মিজান, শফিউল আলম ও মো. ওসমান।

পিবিআই চার্জশিটে উল্লেখ করেছে, হালিশহর খাদ্যগুদামের ম্যানেজার প্রণয়ন চাকমা ও মো. ফখরুল আলম মানিক চট্টগ্রাম বিভাগীয় খাদ্য পরিদর্শক সমিতির প্রধান হওয়ায় তাদের নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে সিএসডিতে সব কার্যক্রম পরিচালিত হতো বলে তদন্তে জানা যায়। তারা খাদ্য অধিপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত পদে থাকা অবস্থায় যৌথভাবে অবৈধ পন্থায় অধিক মুনাফালাভের উদ্দেশে খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন খাদ্যশস্য সরকারি গুদামে সংরক্ষণ করে সহযোগী আসামি চাল ব্যবসায়ী সাহাব উদ্দিন ও তাদের যৌথ মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন চাল ব্যবসায়ীর কাছে সরকারি চাল

কালোবাজারিতে বিক্রয় করে আসছিলেন। এতে উভয়েই প্রচুর অবৈধ অর্থের মালিক হন।

চার্জশিটে আরও উল্লেখ করা হয়, খাদ্য অধিদপ্তরের নিজস্ব তদন্তে চট্টগ্রামের ৪০টি খাদ্যগুদামে সরকারি রেকর্ডে থাকা চালের সঙ্গে গুদামে রক্ষিত চালের হিসাব মিলিয়ে দেখা হয়। তখন খাদ্য অধিদপ্তরের ৫০ নম্বর গুদামে ৬৩.১০০ টন রেকর্ডবহিভূত অতিরিক্ত চালের মজুদ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ৪৮ ও ১২৫ নম্বর গুদামে রেকর্ডের অতিরিক্ত প্রচুর ঝুরা চালের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তদন্তে নেমে পুলিশও এই অবৈধ চাল চোরাচালানের সন্ধান ও সত্যতা পায়।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, সরকারি খাদ্যগুদাম চাল নিয়ে ট্রাকগুলো গুদামের সাধারণ ওজন স্কেল ও চেকপোস্টের সামনে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু ওজন স্কেল ও চেকপোস্টের রেজিস্টারে চাল চোরাচালান হওয়া ট্রাকের নম্বর ও ঠিকানা এন্টি করা হতো না। এ সিন্ডিকেট সবাইকে ম্যানেজ করেই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল।

২০১৭ সালের ১৮ জুলাই সরকারি গুদাম থেকে পাচারের সময় চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৯৬ বস্তায় ৭ ট্রাক ভর্তি ১৫৫ টন চাল আটক করেছে র‌্যাব-৭। এ ঘটনায় নগরীর হালিশহর থানায় সরকারি চাল চোরাচালানের ঘটনায় একটি মামলা করা হয়। ওই দিন র‌্যাবের একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগরীর হালিশহর ও সিটি গেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে সরকারি চালগুলো জব্দ করে। জব্দ করা প্রতিটি চালের বস্তার গায়ে খাদ্য অধিদপ্তরের সিলমারা ছিল। পরে হালিশহর থানা পুলিশ এ মামলার তদন্ত করে। তাদের তদন্তে ত্রুটি থাকায় মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন আদালত। পিবিআই তদন্ত শেষে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি চাল চোরাচালান মামলার চার্জশিটটি চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে জমা দেন। বর্তমানে মামলার চার্জশিটটি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে।