কক্সবাজারে ৬ জেলের লাশ উদ্ধার

টেংরারচরে ট্রলারডুবি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৯

কক্সবাজার অফিস ও চরফ্যাসন (ভোলা) প্রতিনিধি

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০ মে থেকে সাগরে যাচ্ছে না কোনো ট্রলার। এর ওপর লঘুচাপের প্রভাবে পাঁচ দিন ধরে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল। জারি রয়েছে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত। নিষেধাজ্ঞা ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে গত শনিবার সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ডুবে যায় একটি ট্রলার। ভোলার চরফ্যাসন এলাকার ওয়াজ উদ্দিন মিন্টুর মালিকানাধীন এ ট্রলারে ১৪ জন মাঝিমাল্লা ছিলেন। গতকাল বুধবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সি-গাল পয়েন্ট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ট্রলারটি। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে হতভাগ্য ছয় জেলের লাশ। ক্ষতিগ্রস্ত ট্রলার থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে দুই জেলেকে। এখনও নিখোঁজ আছেন ছয়জন। তারা সবাই ভোলার চরফ্যাসনের জেলেপল্লীর বাসিন্দা। মনপুরার টেংরারচর এলাকায় ডুবেছিল ট্রলারটি।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি (তদন্ত) মো. খায়রুজ্জামান জানান, বুধবার সকাল ৮টার দিকে সৈকতের সি-গাল পয়েন্টে একটি ট্রলার ভেসে আসার খবর পায় পুলিশ। ট্রলারটির ভেতর থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দু'জনকে উদ্ধার করা হয়। ভেতরে দুটি লাশ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ট্রলারের পাশে সাগরে ভাসমান অবস্থায় চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। জীবিত দু'জনের চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। লাশগুলোও একই হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

নিহতরা হলেন ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার মাদ্রাজ ইউনিয়নের চরনাজিমুদ্দিন গ্রামের তরিকুল ইসলামের ছেলে কামাল, আব্দুস শহীদের বাবুল, জিন্নাগড় ইউনিয়নের নুর মোহাম্মদের ছেলে অলি উদ্দিন ও

বজলু হাওলাদারের ছেলে অজিউল্লাহ। চেহারা ও দেহ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় অন্য দু'জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শাহিন আবদুর রহমান জানান, অসুস্থ দুই জেলের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তাদের ফুসফুসে পানি ঢুকেছে। তার ওপর কয়েকদিন ধরে অভুক্ত থাকায় অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। তারা হলেন, জুয়েল (২৫) ও মনির মাঝি (৩৫)। তারা চরফ্যাসনের চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের চর নাজিমউদ্দিন গ্রামের বাসিন্দা।

জীবিত জেলেদের বরাত দিয়ে ওসি মো. খায়রুজ্জামান আরও জানান, ৫ দিন আগে ভোলার চরফ্যাশন থেকে ট্রলারটি নিয়ে তারা বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। ট্রলারে ১৪ জন জেলে ছিলেন। শনিবার সকালে সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের ট্রলার। ওই সময়ে ট্রলারের ইঞ্জিনও বিকল হয়ে যায়। এক পর্যায়ে প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাতে তলা ফেটে সাগরে ডুবে যায় ট্রলারটি। তারা সবাই ডুবে যাওয়া ট্রলারের কাঠ আঁকড়ে ধরে সাগরে ভাসছিলেন। প্রচণ্ড ঝড় ও উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে

দু'জন বেঁচে গেলেও বাকিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তারা তা জানেন না।

কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি জিল্লুর রহমান জানান, এ ঘটনায় নিখোঁজ আরও ছয় জেলের সন্ধানে অভিযান চলছে। কক্সবাজার জেলা বোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ বলেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলারটি দুর্ঘটনায় পড়েছে। জেলেদের প্রাণহানির জন্য ট্রলার মালিককে আইনের আওতায় আনতে হবে। দুর্ঘটনার শিকার ট্রলারের মালিক ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের ওয়াজ উদ্দিন মিন্টু। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ১৪ জন মাঝিমাল্লা নিয়ে ট্রলারটি পাঁচ দিন আগে চরফ্যাসনের মেঘনা নদীর সামরাজ ঘাট থেকে রওনা হয়। বুধবার সকালে খবর পান ট্রলারটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বলেন, লাশগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। ট্রলারটিতে একটি মাছ ধরার জাল পাওয়া গেছে। মৃতদেহগুলো বিকৃত হয়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সাগরে মাছ ধরতে নামায় ট্রলার মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত কয়েকদিনে সাগরে মাছ ধরার সময় ঝড়ের কবলে পড়ে ভোলার চরফ্যাসনের চরমাদ্রাজ ও আহাম্মদপুর ইউনিয়নের দুটি ট্রলার ডুবে যায়। এসব ঘটনায় ২৯ জেলে নিখোঁজ ছিলেন। তার মধ্যে গত শনিবার মনপুরার টেংরারচর এলাকায় মনির মাঝির ট্রলার ও রোববার ঢালচর উপকূলের শিবচর এলাকায় শাহজাহান মাঝির ট্রলার ডুবে যায়। কক্সবাজারে উদ্ধার হওয়া ট্রলারটি টেংরারচরে ডুবে যাওয়া মনির মাঝির ট্রলার ছিল। কক্সবাজারে জেলেদের লাশ উদ্ধারের খবরে উপজেলার আহাম্মদপুর, মাদ্রাজ, রসুলপুর ইউনিয়নের জেলেপল্লীগুলোতে শোকের মাতম শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় হতাহত ও নিখোঁজদের স্বজনরা ইতিমধ্যে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। অনেকে থানায় ভিড় করছেন। নিখোঁজদের বিষয়ে তথ্য জানাতে পুলিশ কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধ করছেন।

চরফ্যাসন থানার ওসি সামসুল আরেফিন জানান, শোকাহত জেলে পরিবারগুলোর পাশাপাশি কক্সবাজার সদর থানার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।