লাইফওয়ের জিম্মিদশায় থাকা ১৫৫ তরুণ উদ্ধার

প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৯

গাজীপুর প্রতিনিধি

লাইফওয়ের জিম্মিদশায় থাকা ১৫৫ তরুণ উদ্ধার

বুধবার রাতে গাজীপুরের চৌরাস্তার উনিশে টাওয়ারের অবৈধ এমএলএম প্রতিষ্ঠান লাইফওয়ে বাংলাদেশের জিম্মিদশা থেকে র‌্যাবের হাতে উদ্ধার ১৫৫ তরুণ - সমকাল

রাকীব হাওলাদারের বয়স পনেরো পেরোয়নি। বাবা নুরুল হাওলাদারের সঙ্গে অন্যের বাড়িতে কৃষিকাজে সহযোগিতা করত। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় রাকিবের দায়িত্বটাও বেশি। তাই সে উপার্জনের আশায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেও। বরগুনার বেতাগী উপজেলার পল্লীমঙ্গল এলাকার নুরুল হকের ছেলে রাকীবকে সাড়ে ১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে একটি চাকরির সন্ধান দেন সজীব হাসান নামে এক যুবক। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে বেতন হবে দ্বিগুণ। ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার টাকা কিস্তি ও চড়া সুদে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সজীবের হাতে তুলে দিয়ে গাজীপুরে 'লাইফওয়ে বাংলাদেশ' নামের প্রতিষ্ঠানটিতে যোগদান করে রাকীব। প্রশিক্ষণ শেষে এক পর্যায়ে রাকীব বুঝে গেল প্রতারণার ফাঁদে পড়েছে সে।

রাকীবের মতো শত শত তরুণের গল্প একই রকম। প্রতারণার ফাঁদ পেতে আনা তরুণদের একটি ঘরে প্রশিক্ষণের নামে আটকে রাখা হতো। প্রতারণার কথা ফাঁস করলেই মামলা ও হত্যার হুমকি। অবশেষে গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকার উনিশে টাওয়ারের 'লাইফওয়ে বাংলাদেশ' নামে প্রতিষ্ঠানটিতে গতকাল বুধবার রাত ৯টায় অভিযান চালায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। সেখানকার জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৫৫ জনকে। গ্রেফতার করা হয়েছে প্রতারক চক্রের হোতা জহিরুলসহ ২০ জনকে।

র‌্যাব-১ এর পোড়াবাড়ি ক্যাম্পের ইনচার্জ লে. কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বেকার তরুণদের স্বপ্নপূরণের কথা বলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই প্রতারক চক্র। ভয়ঙ্কর চক্রের ২০ সদস্য গ্রেফতার হওয়ার পর র‌্যাবের কাছে বর্ণনা করেছে তাদের প্রতারণার নানা কৌশল। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এমএলএম ব্যবসার কোনো অনুমোদন নেই। অথচ গাজীপুর

চৌরাস্তায় দীর্ঘদিন ধরে লাইফওয়েসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের প্রতারণামূলক ব্যবসা করছে।

উদ্ধার হওয়া মিলটন দাস নামে সিলেটের এক তরুণ জানান, তিনি এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই লাইফওয়েতে চলে আসেন। মূলহোতা জহিরের হাতে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি এখানে ভর্তি হন। ১৪ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার কথা বললেও গত দুই মাসে এক টাকাও দেওয়া হয়নি।

প্রতারণার শিকার অনেক তরুণ জানান, চাকরির কথা বলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় বেকার তরুণদের তারা গাজীপুরে নিয়ে আসে। প্রথমেই তাদের চোখে পড়ে প্রতিষ্ঠানের সামনে লাগানো সাইনবোর্ডে। সেখানে লেখা আছে, 'এখানে কাউকে চাকরি প্রদান করা হয় না, পণ্য বিপণনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের পথ তৈরি করে দেওয়া হয়।' এরপরই প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে চায়ের দোকানে নিয়ে তাদের 'মগজধোলাই' করে সহজে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়। এ জন্য প্রথমে প্রতিষ্ঠানের সদস্য হতে হবে সাড়ে ১৪ হাজার টাকায়। বিক্রির জন্য দেওয়া হবে একটি টেলিভিশন। সারা জীবনে দু'জন সদস্য করে টেলিভিশন বিক্রি করতে পারলেই আর কিছু করতে হবে না। তখন সহজ-সরল দরিদ্র কিশোর, তরুণ বা যুবকরা ধাঁধায় পড়ে যান। কোটিপতি হওয়ার সহজ দাওয়াই পেয়ে তারা সদস্য হন।