বন্দরনগরে বেহাল যুবলীগ

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯      

রুবেল খান, চট্টগ্রাম

মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি চাঙ্গা রাখে যুবলীগ। সাংগঠনিক যে কোনো কর্মসূচিতে যুবলীগের নেতাকর্মীরা ক্ষমতাসীন দলের অন্যান্য অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখছে সারাদেশে। তবে বন্দরনগর চট্টগ্রামের চিত্রটা ভিন্ন। ছয় বছর আগে ৯০ দিনের জন্য গঠন করা হয়েছিল চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি। সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন তো দূরের কথা; অর্ধযুগে আহ্বায়ক কমিটিই পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্তরা। নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে এ প্রক্রিয়া বারবার ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি তাদের। অভিযোগ রয়েছে, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির উদ্দীন গ্রুপের কোন্দলের কারণেই জটিলতায় ঝুলছে নগর যুবলীগ।

এমন প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই বন্দরনগরে যুবলীগের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। সৃষ্টি হচ্ছে নেতৃত্বের জট। পদ-পদবি নিয়ে বাড়ছে সহিংসতার আশঙ্কাও। পরিস্থিতি পাল্টাতে নতুন কমিটির দাবি জোরালো হচ্ছে। শীর্ষ পদপ্রত্যাশী হিসেবে কয়েক বছর ধরেই তৎপরতা চালাচ্ছেন অন্তত অর্ধডজন নেতা। তারা হলেন- চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-সম্পাদক হেলাল উদ্দিন চৌধুরী আকবর বাবর, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব, যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুল মান্নান, দেবাশীষ পাল দেবু এবং সাবেক মন্ত্রী আব্দুল মান্নানের ছেলে দিদারুল আলম দিদার। বাচ্চু ও বাবর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও চসিকের সাবেক মেয়র প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। বিপ্লব ও মান্নান চসিকের বর্তমান মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজম নাছিরের অনুসারী।

আলোচিত এই ছয় প্রার্থীর মধ্যে হেলাল উদ্দিন চৌধুরী আকবর বাবরের বিরুদ্ধে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ের টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ে নগরীর কোতোয়ালি থানাধীন সিআরবি এলাকায় ডবল মার্ডার মামলার আসামি ছিলেন বাবর। অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বিবেচনায় আলোচিত এ মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে নিহত সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী এক সময় বাবরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অমিত হত্যাকাণ্ডে বাবরের সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে। যদিও এ মামলার আসামি রিপন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এমন কোনো তথ্য দেয়নি।

চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নেতাকর্মীরা জানান, ২০১৩ সালে মহিউদ্দিন বাচ্চুকে আহবায়ক করে ১০১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি

ঘোষণা করা হয় কেন্দ্র থেকে। ওই কমিটিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীরা বেশি পদ পাওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। আ জ ম নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত মাত্র সাতজন ওই কমিটিতে ঠাঁই পান। মূলত এ নিয়েই বন্দরনগরে যুবলীগের রাজনীতিতে কোন্দল চরম আকার ধারণ করে। তখন থেকেই দুই গ্রুপ পৃথকভাবে সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় যুবলীগ। এরই মধ্যে কাউন্সিলরদের তালিকাও তলব করা হয়েছে। কিন্তু দলীয় কোন্দলের কারণে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের পক্ষ থেকে এখনও কাউন্সিলরদের নামের তালিকা তৈরি করা যায়নি। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু সমকালকে জানান, তারা মনে-প্রাণ চাইছেন চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হোক। সম্মেলন করে কিংবা কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করা যেতে পারে। চট্টগ্রামে সম্মেলন করলে কোনো সমস্যা হবে না বলেই আশা করি। তবে সম্মেলন নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা উড়িয়েও দেওয়া যায় না।

সম্মেলন নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা জানিয়েছেন নগর যুবলীগ নেতা সাহেদ হোসেন টিটু। তার মতে, কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো যাবে। যেভাবেই হোক অবিলম্বে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নতুন কমিটি গঠন করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দেবাশীষ পাল দেবু। দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিলেন তেমন যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদেরই নতুন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে স্থান দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নতুন কমিটিতে স্থান পেতে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের অনেকেই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন বলে উল্লেখ করে নগরীর ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শেখ মহিউদ্দিন বাবু সমকালকে বলেন, ছাত্রলীগের সাবেক অনেক নেতাই উন্মুখ হয়ে আছেন যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার জন্য। তারা চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী নিজেও চট্টগ্রামের সন্তান। চট্টগ্রাম মহানগরের কমিটি প্রসঙ্গে সমকালকে তিনি বলেন, স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে ওই সম্মেলনের জন্য কাউন্সিলরদের তালিকা কেন্দ্রের কাছে পাঠানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কাউন্সিলরদের তালিকা চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো হয়নি। তাই চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। কাউন্সিলরদের তালিকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না।