দেবিদ্বারে কুপিয়ে মা-ছেলেসহ ৩ খুন ঘাতক মুখলেছকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯      

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা

কুমিল্লার দেবিদ্বারের রাধানগর গ্রামে মা-ছেলেসহ প্রতিবেশী তিনজনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় থমথমে পরিস্থিতির পাশাপাশি এলাকায় দেখা দিয়েছে নানা গুঞ্জন। কে এই ঘাতক মুখলেছুর রহমান (৪৫), কেন সে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাল- এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। পুলিশও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার তদন্ত করছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১২ বছর আগে পাশের তালতলা গ্রাম থেকে রাধানগর গ্রামের মামার বাড়িতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে মর্তুজ আলীর ছেলে মুখলেছ। তিন সন্তানের জনক মুখলেছ পেশায় রিকশাচালক হলেও এরই মধ্যে একতলা ভবনের মালিক বনে যাওয়ায় এলাকায় তা সবার দৃষ্টি কেড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে তার আয়ের উৎস নিয়ে। অনেকে সন্দেহ করছেন, মাদক ব্যবসায়ে জড়িত ছিল কি-না। তা ছাড়া হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে মঙ্গলবার রাতে বোরকাপরা নারীসহ কয়েকজন পুরুষ তার বাড়িতে কেন এসেছিল? সে আগে থেকেই দোকানে দা'র অর্ডার কেন দিয়েছিল? সে কি কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল?

প্রতিবেশী এক যুবক বলেন, যে যাই বলুক, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অবশ্যই একটি রহস্য রয়েছে, যা সঠিক তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে।

গতকাল দেবিদ্বার উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে এ হত্যার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। কারণ এ হত্যাকাণ্ডের পর লোকজনের বাইরে বের হওয়া, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে উপস্থিতি কমে গেছে। সভায় এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে আলোচকরা বলেন, গুজবে কান না দিতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরও

সচেতন করতে হবে।

দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, এ ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা, সে বিষয়টি আমরা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছি।

বুধবার সকালে মুখলেছ ধারালো দা দিয়ে প্রতিবেশীদের এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এতে প্রতিবেশী নুরুল ইসলামের স্ত্রী নাজমা আক্তার, শাহ আলমের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও ছেলে আবু হানিফ (১০) ঘটনাস্থলেই মারা যান। দায়ের কোপে আহত হন আব্দুল লতিফ, মাজেদা বেগম, নুরুল ইসলাম, রাবেয়া বেগম, ফাহিমা, জাহানারা বেগম। স্থানীয়রা গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান মুখলেছও।

চোখের সামনে মা-ভাই খুন নিপার :'চোখের সামনেই মা ও ছোট ভাইকে কুপিয়ে মেরেছে প্রতিবেশী মোখলেছ। প্রথমে ছোট ভাই হানিফকে কুপিয়ে মারে। ভাইকে বাঁচাতে গেলে মাকেও কুপিয়ে মারে।' এভাবে মা-ভাই খুনের ঘটনা বলতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন ক্যান্সারে বাবাকে হারানো অসহায় নিপা। বুধবার ঘাতক মুখলেছের ধারালো দায়ের কোপে প্রাণ হারিয়েছেন নিপার মা আনোয়ারা বেগম আনু ও ছোট ভাই হানিফসহ তিনজন।

রাধানগর গ্রামে নিপাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা-ভাইকে হারিয়ে গগনবিদারী আর্তনাদ করতে করতে একপর্যায়ে মূর্ছা যাচ্ছেন নিপা আক্তার। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা। মূর্ছা ভাঙলে ঘরে থাকা মা ও ভাইয়ের পরনের কাপড়ের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। একটু পরপর চিৎকার করে বলছেন, আপনারা আমার মা ও ভাইকে ফিরিয়ে দিন, আমার তো দেখার আর কেউ রইল না।

মাসখানেক আগে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান নিপার বাবা শাহ আলম। এরপর থেকে অবিবাহিত মেয়ে নিপা এবং ছোট দুই ছেলে হানিফ ও আলমকে নিয়ে কোনো রকমে দিন চলছিল আনোয়ারা বেগমের। বিল থেকে মাছ ধরে চালাচ্ছিলেন সংসার। কিন্তু এখন ঘাতকের কোপে তাকেও চলে যেতে হলো।

নিহত আনোয়ারার স্বজনরা জানান, তিন মেয়ে বিয়ে দিলেও ছোট মেয়ে নিপার বিয়ে দেওয়া বাকি। আনোয়ারার বাড়ির ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো সম্পত্তি নেই। এখন মেয়ে নিপার কী হবে, কে দেখবে তাকে?

অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন :প্রকাশ্যে তিনজনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় রাধানগর গ্রামে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। এর আগে সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম। এ সময় তিনি নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।