উজানের ঢলে বন্যা, প্লাবিত কয়েকশ' গ্রাম

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯      

সমকাল ডেস্ক

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণে ও ছয় জেলার বড় অংশে বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েকশ' গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ। সুনামগঞ্জের বেশ কিছু স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। স্থগিত হয়ে পড়েছে বিদ্যালয়ে পাঠদান। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে এই তিন জেলার বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কয়েকটি পয়েন্টে দেখা দিয়েছে ভাঙনও। শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে ২৫ গ্রাম তলিয়ে গেছে। নালিতাবাড়ীর ভোগাই ও চেল্লা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নেত্রকোনার কয়েকটি উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

সুনামগঞ্জ : জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ

পয়েন্টে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় পানি বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বেড়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, দোয়ারাবাজারের নিম্নাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পৌর এলাকার নিম্নাঞ্চল, সদর উপজেলার গৌরারং, মোহনপুর ও সুরমা ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সদরের ইউএনও ইয়াসমিন রুমা জানিয়েছেন, উপজেলার ১০টি স্কুলে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জেলার ২৩৮টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৮ প্রাথমিক স্কুলে পাঠদান স্থগিত করেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) : তাহিরপুরে শতাধিক গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার সব অভ্যন্তরীণ সড়ক নিমজ্জিত থাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পানির তোড়ে ভেসে গেছে যাদুকাটা নদীর পাঁচ শতাধিক ব্যবসায়ীর আনুমানিক ১৫ কোটি টাকার মজুদকৃত বালু। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, বন্যায় পানিবন্দি গ্রামগুলো তিনি ঘুরে দেখছেন এবং তাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) : উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নগুলোর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত সুরমা ও পাহাড়ি নদী চেলা, পিয়াইন ও ইছামতি নদীর পানি কোথাও বিপদসীমার ২০, কোথাও ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সুরমা নদীতে নোঙর করা কার্গো-বাল্ক্কহেড ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পাথর লোডিং-আনলোডিং বন্ধ ছিল। সুরমা নদীতীরবর্তী প্রায় অর্ধশতাধিক ক্রাশার মিল বন্ধ থাকায় দিনমজুর শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন।

কুড়িগ্রাম :সদরের ভোগডাঙ্গা ও পাঁচগাছি ইউনিয়নের জগমোহনের চর, পাঙ্গার চর, জয় সরস্বতী, মাধবরাম, কাইম বড়াইবাড়ি, বড়াইবাড়ি, মণ্ডলপাড়া, কাশিচর, কুড়িয়ার বাজার, কদমতলা, দক্ষিণ সিতাইঝাড় ও চর ওয়াপদা এ ১২টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ধরলার ফেরিঘাট পয়েন্টে ৩৭ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী পয়েন্টে ৩৩ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ৪৫ সেন্টিমিটার ও তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) :উপজেলার বিপুল পরিমাণ আবাদী জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে ২০০ বিঘা আশ্রয়ণ কেন্দ্র, দক্ষিণ খাউরি স্কুল ও নয়ারহাট ইউনিয়ন পরিষদ ভবন। অষ্টমীরচর ইউনিয়নে গতকাল মুদাফৎকালিকাপুর ও চরমুদাফৎকালিকাপুর এলাকায় প্রায় ৪০টি বাড়িসহ গত তিন দিনে প্রায় শতাধিক বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে।

গাইবান্ধা :বিভিন্ন উপজেলায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতীরবর্তী বিভিন্ন চরের নিচু এলাকাগুলোতে পানি ঢুকে পড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এদিকে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় তা মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গতকাল কালেক্টরেট সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভা হয়। এতে সংশ্নিষ্ট ইউএনওদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দ্রুত মেরামতের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) :ব্রহ্মপুত্রের পানি অস্বাভাবিক বাড়ায় উপজেলার নদীবেষ্টিত চরগুলোর নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার বসতবাড়ির লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে পাট, শাকসবজির ক্ষেতসহ সদ্য রোপণকৃত বীজতলা তলিয়ে গেছে। নদের কয়েকটি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে ফজলুপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১৬০টি পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে।

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) :তিস্তার পানি বাড়ায় নিচু এলাকার পরিবারগুলো পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে বিপাকে পড়েছে চরাঞ্চলবাসী। হরিপুর, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর ইউনিয়নের কিছু কিছু এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

জলঢাকা (নীলফামারী) :গতকাল সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত পানি বেড়ে তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে জানান ডালিয়া ডিভিশন নির্বাহী প্রকৌশলী। তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদীরতীরবর্তী জেলার জলঢাকা ও ডিমলাসহ জেলার সাতটি ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি চরগ্রামের সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

শেরপুর ও সীমান্ত অঞ্চল : ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশি নদীর বাঁধ ভেঙে পাঁচ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের প্রায় ২৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঝিনাইগাতী সদর, ধানশাইল, গৌরীপুর, হাতিবান্ধা ও মালিঝিকান্দা। এসব ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কাঁচা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, রোপা আমন ধানের বীজতলা পুকুরের মাছ পানিতে তলিয়ে গেছে। ঢলের পানিতে অনেক মানুষ ও গৃহপালিত পশু পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ঝিনাইগাতীর ইউএনও রুবেল মাহমুদ বলেন, বেশ কিছু এলাকা পরিদর্শন করেছি। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি। গতকাল দুপুর পর্যন্ত নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ও চেল্লা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

নেত্রকোনা : জেলার দুর্গাপুর, বারহাট্টা ও কলমাকান্দার প্রায় ১৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তিন উপজেলায় অন্তত দুই শতাধিক গ্রামে প্রায় ৫০ হাজারের মতো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকছে।গ্রামীণ বেশ কয়েকটি সড়ক পানির নিচে থাকায় উপজেলা ও জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গত সোমবার থেকে মাঝারি ও ভারি বৃষ্টিপাতে জেলার প্রধান নদী কংস, সোমেশ্বরী, ধনু ও উব্দাখালীতে পানি বিপদসীমার ওপরে রয়েছে। শতাধিক পুকুর ও মৎস্য খামারে পানি প্রবেশ করে মাছ ভেসে গেছে। গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্গাপুরের বিরিশিরি ও কাকৈরগড়া ইউনিয়নের ১৯৬টি পরিবার ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কে ইন্দ্রপুর নামক স্থানে সেতু ও সড়ক ঝুঁকিতে আছে।

কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) : গতকাল উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ২৫০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। প্রায় তিন হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। উপজেলা সদর থেকে বিভিন্ন ইউনিয়নে যাওয়ার রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। উপজেলার আটটি ইউনিয়নই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বড়খাপন, খারনৈ, কলমাকান্দা, রংছাতী ও পোগলা ইউনিয়ন। নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মানু মজুমদার কলমাকান্দাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি করে সাংবাদিকদের জানান, পরপর দু'দফায় প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এ উপজেলা। তিনি উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, দিনমজুর ও মৎস্য চাষিদের পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ, বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট মেরামত এবং ধসে যাওয়া সেতু-কালভার্ট পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সদয় বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান।