হাইকোর্টে প্রতিবেদন নির্দোষ জাহালমের ৩ বছর কারাভোগের দায় দুদকেরই

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভুলেই নির্দোষ পাটকল শ্রমিক জাহালমকে ঋণজালিয়াতির ঘটনায় অভিযুক্ত আবু সালেক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। আর এক্ষেত্রে দুদকের কর্মকর্তাদের ভুল পথে চালিত করতে ভূমিকা রেখেছেন বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা এবং অ্যাকাউন্টের ভুয়া ব্যক্তিকে পরিচয়দানকারীরা। দুদকের মামলায় বিনা অপরাধে জাহালমের তিন বছর কারাভোগের ঘটনায় দুদকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চে গতকাল বৃহস্পতিবার দুদকের এ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরে এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী মঙ্গলবার দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট। আদালতে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান, রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার এবং সংশ্নিষ্ট ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান। অন্যদিকে জাহালমের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত।

নির্দোষ জাহালমের কারাবাসের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে গত ১৭ এপ্রিল দুদককে অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ওই আদেশ অনুযায়ী দুদকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রধান আবুল হাসনাত মো. আব্দুল ওয়াদুদের প্রতিবেদন গতকাল আদালতে দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে কমিটির প্রধান বলেন, সার্বিক বিবেচনায় তার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, জাহালমকে আবু সালেক রূপে চিহ্নিত করার যে ভুলটি হয়েছে, তা দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কারণেই ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সঠিক ঘটনা তথা সত্য উদ্ঘাটন করে আদালতের কাছে উপস্থাপন করা তদন্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তা বা অন্য কারও ওপর এই দায়িত্ব অর্পণের কোনো সুযোগ নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একই ঘটনায় একাধিক মামলা করা আইনসন্মত নয়। তার পরও একটি মামলার পরিবর্তে ৩৩টি মামলা করা এবং ঘটনাস্থলগুলো পরিবর্তন করে ফেলার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন জড়িত ছিল। অভিযোগটির অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা, তদারককারী কর্মকর্তা বা সংশ্নিষ্ট মহাপরিচালক কেউই এ বিষয়ে দুদকের লিগ্যাল অনুবিভাগের আইনগত মতামত নেননি। তাই এ ভুলের দায় আইও, তদারককারী কিংবা সংশ্নিষ্ট মহাপরিচালক এড়াতে পারেন না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অর্থপাচার-সংক্রান্ত মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে অর্থের গন্তব্য বিষয়ে তদন্ত করলে এবং তা খুঁজে পাওয়া গেলে স্বাভাবিকভাবেই অপরাধীর খোঁজ পাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের একটি অযোগ্যতা ছিল। একই সঙ্গে এই মামলায় অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত থাকলেও তাদের অভিযুক্ত করা হয়নি। কিন্তু তাদেরও চার্জশিটভুক্ত করা উচিত ছিল। এই মামলায় ১২ জন তদন্ত কর্মকর্তা

তদন্ত প্রতিবেদন দুদকে দাখিল করেন। কিন্তু কেউই আসামি জাহালমের বাড়ি পরিদর্শন করেননি। পরিদর্শন করলেই জাহালমের বাড়ির প্রকট দৈন্যদশা দেখে ১৮ কোটি টাকা সে আত্মসাৎ করেছে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিত।

তদন্ত কর্মকর্তাদের যোগ্যতা প্রশ্নে প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ২০১০ সালে প্রথমে মতিঝিল থানায় মামলা করা হলে পুলিশ প্রথমে তদন্ত করে। পরে মামলাটি তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়। একই ঘটনা অনুসন্ধান করে দুদক ৩৩টি মামলা করে। যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। মতিঝিলের মামলায়ই চার্জশিট দেওয়া সম্ভব ছিল। ৩৩টি পৃথক মামলা করায় তদন্ত করতে বিভিন্ন জটিলতা হয়েছে এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। দুদক থেকে ওই ৩৩টি মামলা করার পর ২০১১ সালের আগস্ট মাসে দুদকের শিক্ষানবিশ কর্মকর্তাদের তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ করার পর পরই তাদের এ ধরনের অত্যন্ত জটিল কাজে সম্পৃক্ত করা হয়।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ :ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, একটি ফরেনসিক অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট তৈরি ফিন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন প্রোফাইল তৈরি ও প্রমাণের জন্য ফরেনসিক অ্যাকাউন্টস খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ বিষয়ে একটি টিম গঠন করাও যেতে পারে। পাশাপাশি সাক্ষী বা আসামির পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্পের তথ্যভাণ্ডারও ব্যবহার করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ভুলভাবে কাউকে আসামি করা হলে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে সঙ্গে তদারককারী কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। একই ঘটনায় একাধিক মামলা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

এতে আরও বলা হয়, জাহালম টাকার বিনিময়ে আসামি সেজে জেল খাটছে বলে দুদকে পাঠানো বেনামি চিঠির বিষয়েও তদন্ত করতে হবে।

পরে প্রতিবেদনের বিষয়ে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, 'সমন্বয়হীনতার কারণেই এমনটা হয়েছে। জাহালম তিন বছর জেল খেটেছে- এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এখন এর জন্য কে কতটুকু দায়ী তা আদালত নির্ধারণ করবেন।' অন্যদিকে জাহালমের কারাবাসের বিষয়টি যিনি হাইকোর্টের নজরে নেন, সেই আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত সাংবাদিকদের বলেন, দুদক স্বচ্ছভাবেই তদন্ত করেছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ দুদক নিজেই নিজেদের দায় স্বীকার করে নিয়েছে। ভবিষ্যতে দুদক যাতে এ রকম ভুল আর না করে তার জন্য সুপারিশও আছে প্রতিবেদনে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে এমনটা আর ঘটবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।