অস্বাভাবিক লবণ বলেশ্বর নদে

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯      

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

পিরোজপুর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মিঠাপানির বলেশ্বর নদে লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে নীরবে এ ঘটনা ঘটলেও গত বছর শুস্ক মৌসুমে বিষয়টি সবার নজরে আসে। বলেশ্বরের পানি শোধন করে পিরোজপুর শহরে সরবরাহ করা হয়। লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ওই পানি পানের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এর পর পৌরসভা থেকে শুরু করে সব মহলের টনক নড়ে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলেশ্বর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করলে পানিতে অধিক পরিমাণ লবণ থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নদের নাব্য কমে যাওয়ায় জোয়ারে সাগর থেকে আসা লবণ পানি ভাটায় নামতে না পারায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এটি অব্যাহত থাকলে পিরোজপুরে সুপেয় পানি সংকটের পাশাপাশি কৃষি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন সব মহল।

বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী বায়োকেমিস্ট মো. মুনতাসির রহমান সমকালকে বলেন, বলেশ্বরের পানিতে লবণ বেড়ে যাওয়ায় পিরোজপুর শহরে সুপেয় পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না- এমন একটি বিষয় গত শীত মৌসুমে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় আলোচনা হয়। এর পর পরীক্ষায় দেখা যায়, নদে লবণের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেশি। গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ধারাবাহিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি মাসেই আগের মাসের চেয়ে লবণাক্ততা বাড়ছে। তবে জুন মাসে কিছুটা কমেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এ বিশেষজ্ঞের মতে, জুন মাসে বৃষ্টি হওয়ায় লবণের পরিমাণ সাময়িক কমেছে। বর্ষা মৌসুম শেষে আবার বাড়বে। এপ্রিল পর্যন্ত বলেশ্বরের পানিতে তড়িৎ পরিমাপ (লবণের মাত্রা) ছিল ১২৩১ সেন্টিমিটার। শুস্ক মৌসুমে এ মাত্রা ১৫০০ অতিক্রম করলে পিরোজপুর জেলায় কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

পিরোজপুর পৌরসভার পানি শাখার প্রকৌশলী শামীমুর রহমান জানান, পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলার সীমানায় বলেশ্বর সেতুর পাশে স্থাপিত শোধনাগারে নদের পানি শোধন করে পৌর এলাকায় সরবরাহ করা হয়। লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পানি খাওয়ার অনুপযোগী হলে শহরবাসী অভিযোগ করতে থাকেন। প্রকৌশলী বলেন, বর্ষা শেষে আবারও লবণের মাত্রা বাড়লে শহরে সুপেয় পানি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়বে।

মিঠাপানি লবণাক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদ আহম্মেদ বলেন, মঠবাড়িয়া উপজেলা সংলগ্ন সুন্দরবনের মোহনা থেকে পিরোজপুর শহরের দিকে প্রবাহিত নদের নাম বলেশ্বর। তবে এ নদের মাঝের কিছু অংশকে স্থানীয়ভাবে 'কচা নদী' বলা হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, বলেশ্বর পিরোজপুর শহরের পাশ দিয়ে বাগেরহাটের দিকে প্রবাহিত হয়ে মধুমতি নাম ধারণ করেছে। মধুমতির নাব্য আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জোয়ারে মঠবাড়িয়া থেকে সাগরের লবণ পানি বলেশ্বরে ধাবিত হয়। কিন্তু মধুমতির নাব্য কমে যাওয়ায় ভাটায় লবণ পানির বড় অংশ বলেশ্বরে থেকে যাচ্ছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, মধুমতির বিশারকান্দি পয়েন্ট থেকে কচা পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার খনন করতে হবে। খননের প্রস্তাব পাউবোর ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

এর বিরূপ প্রভাব প্রসঙ্গে বরিশাল মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকতা সাব্বির হোসেন বলেন, মধুমতি খনন না হওয়ায় পানির প্রবাহ কমে এর প্রভাব বলেশ্বর নদ পর্যন্ত পৌঁছেছে। জোয়ারে প্রবেশ করা সাগরের লবণ পানি ভাটায় বের হতে পারছে না। ফলে ওই অঞ্চলে ফলন কমে যাবে ও মাটির অবক্ষয় বাড়বে। তিনি বলেন, গত বছর বলেশ্বরের পানি মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট পরীক্ষা করেছে। পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বলেশ্বরের লবণাক্ততা এখন আশঙ্কাজনক। ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরও বাড়তে পারে।

পিরোজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু হেনা মো. জাফর বলেন, বলেশ্বর নদে লবণাক্ততা বাড়ায় গত বছর জেলায় ধানের ফলন কম ছিল। নদে লবণাক্ততা বাড়লে গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে ও ফলন কমে যাবে।