পার্বত্য এলাকায় পানিবন্দি কয়েক লাখ মানুষ

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯

সমকাল ডেস্ক

টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় সব নদীর পানি বেড়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন নিরাপদ স্থানে। কিছু কিছু স্থানে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। আর এখন পর্যন্ত পানিতে ডুবে দু'জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বন্যায় আক্রান্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা বাড়িয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। তারপরও অনেক স্থানে এখনও ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

রাঙামাটি ও বাঘাইছড়ি : রাঙামাটিতে কাচলং নদীর পানি বেড়ে বাঘাইছড়ির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে শতাধিক গ্রাম ও ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ

স্থান থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পাহাড় ধসের আশঙ্কায় রাঙামাটি শহরে ৫টি ও বাঘাইছড়িতে ২৪টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩শ' পরিবার এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গতদের মধ্যে শুকনো খাবার, চাল ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়েছে। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান হাবিব জিতু জানান, উপজেলার ২৪টি আশ্রয় কেন্দ্রে ২৫০টি পরিবারকে শুকনো খাবার ও চাল দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ এলে ত্রাণ বিতরণ করা হবে।

উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। বুধবার বালুখালী ইউনিয়নের বসন্ত পাংখোয়াপাড়ায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভানরৌকিমি পাংখোয়া নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আছেন তার স্বামী বেনজাও পাংখোয়া। আরও কয়েকজন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আছেন।

এদিকে রাঙামাটির লংগদু উপজেলা সদরের কাপ্তাই হ্রদ থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বরকল উপজেলার ভুষণছড়া ইউনিয়নের উজানছড়ির আগের ছড়া এলাকায় বুধবার বিজুরাজ চাকমা (৬৫) নামে আরেকজন নদীর জোয়ারে ভেসে যান। ওই দিন সন্ধ্যায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

পটিয়া :চট্টগ্রামের পটিয়ায় শ্রীমাই খালের বেড়িবাঁধ ভেঙে উপজেলার ভাটিখাইন, কচুয়াই, খরনা, কেলিশহর, হাইদগাঁও, আশিয়া, ছনহরা, হাবিলাসদ্বীপ, জঙ্গলখাইন, বড়লিয়া, দক্ষিণ ভূর্ষি, ধলঘাট, কাশিয়াইশ ও কোলাগাঁও এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। এসব এলাকার মাটির তৈরি বসতঘরগুলো ভেঙে যায়। বাঁধের ওপর খোলা আকাশের নিচে রাত পার করছেন অনেক মানুষ। উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করেছেন। তবে এখনও সরাসরি ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান জানান, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করতে ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শুকনো খাবারও বিতরণ করা হবে। এ জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

উখিয়া :কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা, সোনারপাড়া, কোটবাজার, বালুখালী, থাইংখালী, কুতুপালংসহ অন্যান্য এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাস্তাঘাট নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যানবাহন সংকটও দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বেড়ে গেছে খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম।

চকরিয়া :মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়ায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। দুই উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অভ্যন্তরীণ সব সড়কের। সড়কগুলো কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আক্রান্ত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভেসে গেছে বিভিন্ন পুকুরের মাছ। প্রায় ৩০ হাজার একর জমির সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত তলিয়ে গেছে পানিতে।

চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, উপজেলা প্রশাসন সব স্থানের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছে। আক্রান্ত এলাকার মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছাতে জরুরি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম বলেন, চকরিয়া ও পেকুয়ার বানভাসি কোনো মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকে সে জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে সবাইকে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।

ফুলগাজী :ফেনীর ফুলগাজীতে মুহুরী নদীর বাঁধের কয়েক স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ৯টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার আধাপাকা ও কাঁচা ঘরবাড়িসহ মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানি বাড়তে থাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার ফেনী-বিলোনিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক ও স্থলবন্দর সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে এ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফেনী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজন চৌধুরী, ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আক্রান্ত এলাকা ঘুরে দেখেছেন।