সাইক্লোস্টাইল মেশিনটা সাজিয়ে রাখা আছে এক পাশে। এটা ১৯৬৯ সালে তৈরি। ফটোকপিয়ার তখন আবিস্কার হয়নি। এই যন্ত্র দিয়েই কপি করা হতো বিভিন্ন নথি। কালি মেখে এবং হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চলত লেখা কপি করার কাজ। প্রবীণদের মাঝে এই যন্ত্র পরিচিত ছিল ডুপ্লিকেটর হিসেবে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এই যন্ত্র দেখেনি কখনও।

সাইক্লোস্টাইলের উল্টো পাশেই খুলনার ফুলতলা উপজেলার মানচিত্র, দেয়ালে ঝুলছে। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে এই ম্যাপ তৈরি করা হয় সেই ১৯১২ সালে। অবশ্য ওই সময়কার বেশিরভাগ ম্যাপই হাতে আঁকা। এর পাশেই প্রায় ৫০-৬০ বছরের পুরনো জরিপ কাজে ব্যবহূত কাঠের নানা উপকরণ।

বিলুপ্তপ্রায় এমন নানা যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নিয়ে ব্যতিক্রমী প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে খুলনার সদর ভূমি অফিসে। আর এই প্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয়েছে-'স্মৃতির পাঠশালা'। এখানে প্রদর্শনীর জন্য রাখা সবকিছুই খুলনার ভূমি অফিসে ব্যবহূত। ৪০-৫০ বছর আগে ব্যবহার করা যন্ত্রপাতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পরিচিত নয়। মূলত বিলুপ্ত হতে যাওয়া এসব যন্ত্রের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই উদ্যোগ নিয়েছেন খুলনার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ বি এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী।

সরেজমিন দেখা গেছে, জেলা প্রশাসনের রাজস্ব ভবনের নিচতলায় সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিস। দ্বিতীয় তলায় সহকারী কমিশনারের কার্যালয়। সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠে ডানে ঢুকতে চোখে পড়বে টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নানা ধরনের পুরনো যন্ত্রপাতি। ওপরে লেখা 'স্মৃতির পাঠশালা'। এর পাশে পত্রিকা পড়ার স্ট্যান্ড, বিশ্রামের জায়গা, ফুলের বাগান তো আছেই।

প্রথমেই সাইক্লোস্টাইল মেশিন। ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা জানান, ডুপ্লিকেটরটির বয়স প্রায় ৫০ বছর। গত ৩০ বছর ধরে এটি ব্যবহার হয় না। এই যন্ত্র দিয়েই একসময় বিভিন্ন নথি কপি করা হতো। সাইক্লোস্টাইলের পাশে দুটি টাইপরাইটার। এর মধ্যে একটি ম্যানুয়াল, অন্যটি পোর্টেবল। ম্যানুয়াল টাইপরাইটার মেশিনটি ১৯৭০ সালের পরে আর ব্যবহার হয়নি। অন্যদিকে পোর্টেবল টাইপটাইটারটি ব্যবহার হয়েছে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত।

এ ছাড়া একপাশে রয়েছে প্রথম প্রজন্মের প্রিন্টার। ২০০০ সাল পর্যন্ত এই প্রিন্টার ব্যবহার হতো। এগুলো ছাড়াও বাঁশের কঞ্চি ও কালি দিয়ে লেখা বিভিন্ন নথি, জরিপ কাজে ব্যবহূত কাঠের ট্রাইপড সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

স্মৃতির পাঠশালার উদ্যোক্তা খুলনার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ বি এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, 'প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় এখন মোড়ে মোড়ে ফটোকপি মেশিন। ডেস্কটপ কম্পিউটার, ল্যাপটপের বদৌলতে টাইপরাইটার হারিয়ে গেছে অনেক আগে। নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই সাইক্লোস্টাইল মেশিন দেখেনি। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে যে ম্যাপ আঁকা হতো, এটা ক'জন জানে? মূলত তাদের জন্যই এই আয়োজন।'

তিনি জানান, খুলনা সদর ভূমি অফিসের বয়স প্রায় ২০০ বছর। ১৮৫০ সালে ভূমি অফিসটি ছিল বর্তমান ডাকবাংলো মোড়ে। ১৯৮৪ সালে অফিসটি সেখান থেকে সরিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব ভবনে আনা হয়। আগের ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ জন্য অনেক যন্ত্রপাতি হারিয়ে গেছে। মানুষ যুগ যুগ ধরে এসব যন্ত্র ব্যবহার করেছে। শত বছরের পুরনো এসব যন্ত্র এখন অন্যতম প্রত্নসম্পদ।

খালিদ হোসেন সিদ্দিকী জানান, নিজ উদ্যোগে এটা শুরু করলেও এখন জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন সব কর্মকর্তার সহযোগিতা পাচ্ছেন। শিগগিরই স্মৃতির পাঠশালায় ১৮৯০ সালে ব্যবহূত খাজনা আদায়ের সিন্দুক, ব্রিটিশ আমলের গোল টেলিফোন, ওই সময়কার ঘড়ি, কোর্ট ফি, স্ট্যাম্পসহ বিভিন্ন জিনিস সংযোজন করা হবে।

মন্তব্য করুন