'আজকে হ্যামার বাড়ি নদী ভাঙছে, বাড়ি সরেয়া মাইনষের জমিত ঘর তুলনং।' এই আক্ষেপ নদীভাঙনের শিকার কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চরবিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রফিকুল ইসলামের। উত্তরবঙ্গের নদীবিধৌত অঞ্চলের মানুষের বানের পানিতে যতটা না ভয়, তার চেয়ে বেশি আতঙ্ক নদীভাঙন নিয়ে। কয়েক দিনের বন্যায় কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলার অনেক বাড়িঘর, ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের ওয়াপদা বাঁধ ও স্লুইসগেট ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে প্লাবিত হয়েছে ১৫টি গ্রাম। এদিকে, গতকাল সোমবার পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, যমুনা, নুনখাওয়াসহ বিভিন্ন নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ওপরে রয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে কয়েক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। লাখ লাখ পানিবন্দি মানুষ পর্যাপ্ত ত্রাণ না পাওয়ায় দুর্ভোগে রয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সমকালের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-

কুড়িগ্রাম :কুড়িগ্রাম থেকে নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা সদর হয়ে সোনাহাট স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থান পানিতে তলিয়ে গেছে। গতকাল সকাল ৮টার দিকে ধরলা নদীর পানি উপচে এ সড়কের পাটেশ্বরী, মধ্যকুমোরপুর, চণ্ডীজন ও নাগেশ্বরী এলাকার ছয়টি স্থানে আড়াই কিলোমিটার সড়কের কোথায় এক ফুট, কোথাও দেড় ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে এ সড়কে চলাচলকারীরা পড়েছেন মহাদুর্ভোগে।

জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন জানিয়েছেন, প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হওয়ায় সড়ক-বাঁধ ভেঙে যাওয়ার হুমকিতে পড়েছে। বালুভর্তি সিনথেটিক ও জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এদিকে, জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ৯ উপজেলার ৫৫ ইউনিয়নের ৩৯০টি গ্রাম এখন বানের পানিতে ভাসছে। এসব গ্রামের প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।

চিলমারী প্রতিনিধি জানান, উপজেলার অষ্টমীরচর ইউনিয়নের চর মুদাফৎকালিকাপুর ও কালিকাপুর এলাকায় ৯৫টি, নয়ারহাট ইউনিয়নের খেরুয়ারচর ও ফেইসকা এলাকায় ৬০টি এবং চিলমারী ইউনিয়নে ১৫টি বাড়ি মিলে গত চার দিনে প্রায় ১৭০টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। শত শত একর আবাদি জমি নদীতে ভেঙে যাচ্ছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে মাছবাজার, রাঙার গলামালের দোকানসহ গোটা জোড়গাছ পুরাতন বাজার। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবু তালেব ফকির জানান, নদীভাঙন ও বন্যাকবলিত লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

নাগেশ্বরী প্রতিনিধি জানান, উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের তেলিয়ানীরপাড় পাকারমাথা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ছে সর্বত্র। পানিবন্দি মানুষ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে বাঁধে বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে।

রাজারহাট প্রতিনিধি জানান, উপজেলার বিদ্যানন্দ, ঘড়িয়ালডাঙ্গা, নাজিমখান  ও ছিনাই ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী গ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২০ হাজার মানুষ নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বানভাসি মানুষের জন্য সরকারিভাবে কিছু শুকনা খাবার সরবরাহ করা হলেও বেসরকারিভাবে কেউ এগিয়ে আসেনি।

ফুলবাড়ী প্রতিনিধি জানান, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন পানিতে ভাসছে। গতকাল সরেজমিনে পশ্চিম ধনিরাম গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, একটি বাঁধের ওপর টংঘরে শুধু সাদা ভাত নিয়ে বসে আছেন বুলো বেওয়া নামের এক বৃদ্ধা। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, 'বাঁধত আছোং বাহে। বাড়িভিটায় এক কোমরপানি। খাজনা ভাত পালুং সুদায় খাং বাহে। নাই তকাই (তরকারি), নাই নুন।' তার মতো অবস্থা উপজেলার ২০ হাজার পরিবারের।

গাইবান্ধা :গতকাল ভোরে ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কাতলামারীতে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া সকালে ঘাঘট নদীর পানির তোড়ে সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধের প্রায় দেড়শ' ফুট এবং গোদারহাট এলাকায় সোনাইল বাঁধের প্রায় দুইশ' ফুট এলাকা ধসে পার্শ্ববর্তী ১৫টি গ্রামে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে ফুলছড়ি প্রতিনিধি জানান, রোববার রাতে মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় গতকাল ভোরের দিকে কাতলামারী গ্রামের বাঁধটি বিকট শব্দে ধসে যায়। বাড়িঘরসহ শেষ সম্বল হারিয়ে বাঁধে এসে আশ্রয় নেয় বানভাসি মানুষ। পাউবোর গাফিলতির কারণে বাঁধটি ধসে গেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবারের বন্যায় সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের ২১৩টি গ্রামের দুই লাখ ৫৪ হাজার ৬৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৮ হাজার ২৩০টি। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১১৪টি।

লালমনিরহাট :তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমেনি তিস্তা-তীরবর্তী বানভাসি মানুষের। এদিকে, ধরলা ও রত্নাই নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সদর উপজেলার মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সির্ন্দুণা, পাটিকাপাড়া, ডাওয়াবাড়ি, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা, তুষভাণ্ডার, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ও সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর ইউনিয়ন, কুলাঘাট, মোগলহাটসহ জেলার ২০টি ইউনিয়নের ১৬ হাজার পরিবারের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে ৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

মাদারগঞ্জ (জামালপুর) :পৌর এলাকাসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে বন্যায় পানিবন্দি কয়েক হাজার মানুষ। সরকারি ত্রাণ এখনও বানভাসি মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। তবে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজ মঙ্গলবার থেকে বিতরণ শুরু করা হবে। গতকাল সরেজমিনে পৌর এলাকাসহ বালিজুড়ী, চরপাকেরদহ ও জোড়খালী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, পানিতে বসতবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় গরু-ছাগল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে মানুষ বিভিন্ন সড়কে আশ্রয় নিচ্ছে।



মন্তব্য করুন