সীমানা প্রাচীর ভাঙা নিয়ে দুই সংস্থা মুখোমুখি

শেখ জামাল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯      

সাব্বির নেওয়াজ

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে অবস্থিত 'শেখ জামাল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়'-এর নির্মাণাধীন সীমানা প্রাচীর ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। গত ৪ জুলাই নির্মাণরত অবস্থায় অভিযান চালিয়ে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে সীমানা প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়। বিআইডব্লিউটিএর দাবি, বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর এমনকি মূল ভবনের একটি অংশও বুড়িগঙ্গা নদীর সীমার মধ্যে পড়েছে। সে কারণে উচ্ছেদ করা হয়েছে। অপরদিকে, সরকারি এ বিদ্যালয়ের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর বলছে, বিদ্যালয়ের কোনো অংশ আদৌ নদীর সীমার মধ্যে পড়েনি। খাস জমি ছিল এটি। সরকার থেকেই এ জমি এ বিদ্যালয়ের নামে দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। ঢাকার জেলা প্রশাসক জমিটি বিদ্যালয় নির্মাণের আগে বুঝিয়ে দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে। এর পর সরকারি অর্থে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করে। বিদ্যালয় চালুর চার বছর পরে এসে ভূমি নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর। তারা বলছেন, বিআইডব্লিউটিএর মাঠ পর্যায়ের অতিউৎসাহী কর্মকর্তারা সরকারি বিদ্যালয়ের দেয়াল ভেঙেছেন। গায়ের জোরে নির্মাণ কাজও বন্ধ রেখেছেন তারা। দুই পক্ষই নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে তাদের বক্তব্য জানিয়েছে।

জানা গেছে, রাজধানীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে শিক্ষার্থী ভর্তির চাপ কমানো ও বিভিন্ন এলাকায় ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য ২০১০ সালে সরকার নতুন ১০টি সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে কামরাঙ্গীরচরে স্থাপন করা হয় শেখ জামাল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে চালু হয় এ বিদ্যালয়।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের আবেদন করা হয় শিক্ষা সচিব বরাবর। সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। এর পর নিয়োগ করা হয় ঠিকাদার। চলতি মাসে প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলা অবস্থায় গত ২ জুলাই বিআইডব্লিউটিএ অভিযান চালিয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এ সময় তারা প্রধান শিক্ষককে জানায়, প্রাচীর ও মূল ভবনের একটি অংশ  নদীর সীমানার মধ্যে পড়েছে। ৪ জুলাই বিআইডব্লিউটিএ ফের অভিযান চালিয়ে নির্মাণাধীন দেয়ালের অংশটুকু গুঁড়িয়ে দেয় এবং সেখানে রাখা ইট-বালি-সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রী মাটিচাপা দিয়ে চলে যায়।

পুরো বিষয়টি জানিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদা ইয়াসমিন ৭ জুলাই মাউশির মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, অভিযান চলাকালে তাদের অনুরোধ তোয়াক্কা করেননি বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা।

অভিযানকালে নির্মাণ কাজ তদারকি করা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের

উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শামসুল আলম সমকালকে বলেন, এ বিদ্যালয়ের জমি জেলা প্রশাসক ২০১২ সালে তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। মোট ১ দশমিক শূন্য ৫ একর জমি এক হাজার এক টাকা মূল্যে দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয় বিদ্যালয়ের অনুকূলে। এসব কথা অভিযান চলাকালে তিনি বলতে চাইলেও তার কথা শোনা হয়নি। উল্টো তাকে নাজেহাল করা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে 'ঢাকা মহানগরীতে ১১টি সরকারি স্কুল ও ৬টি কলেজ নির্মাণ প্রকল্প'র আওতায় এ বিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়। গত জুনে প্রকল্পটি শেষ হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক দিদারুল আলম বলেন, 'যথাযথ নিয়ম মেনে এ বিদ্যালয়ের জমি নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি হিসেবে ম্যজিস্ট্রেট, এসি ল্যান্ড, সার্ভেয়ার এসে আমাদেরকে স্বশরীরে জমি বুঝিয়ে দিয়েছেন। এটা যদি নদীর জমি হয়, তাহলে জেলা প্রশাসক তা কীভাবে বরাদ্দ দিলেন?' এ প্রকল্পের সহকারী পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক ড. মো. আমিরুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অপর একটি প্রকল্পের পরিচালক। তিনি সমকালকে বলেন, 'বুড়িগঙ্গা পাড়ের এ জমিটি খাস জমি। আরএস রেকর্ডেও সেটি খাস। মহানগর জরিপে জমির কিছু অংশ কতিপয় ব্যক্তি নিজ নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছিল। জেলা প্রশাসক তা বাতিল করে শেখ জামাল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য বন্দোবস্ত দেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই এ জমি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পেয়েছে।'

সংশ্নিষ্ট ঠিকাদার জানান, তার বিপুল অংকের নির্মাণ সামগ্রী মাটিতে চাপা দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি বিপুল ক্ষতির শিকার হয়েছেন। সরকারি কাজ করতে এসে এমন বিপাকে পড়বেন, বুঝতে পারেননি। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু কালাম মো. আখতারুজ্জামান সমকালকে বলেন, আগে নোটিশ দেওয়া হলে আমরা নির্মাণ সামগ্রী সরিয়ে নিতে পারতাম। প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা বলেন, তারা বিষয়টি সংশ্নিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে জানিয়েছেন। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানাবেন।

এ ব্যাপারে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, 'প্রধান শিক্ষক বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অফিসকে নির্দেশ দিয়েছি আমি।'

এ ব্যাপারে বুড়িগঙ্গায় চলমান উচ্ছেদ অভিযানের তত্ত্বাবধানকারী বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন সমকালকে বলেন, 'সুনির্দিষ্টভাবেই ওই বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর ও মূল ভবনের কিছু অংশ নদীর সীমানার মধ্যে পড়েছে। যে বিধি-বিধান অনুসরণ করে আমরা উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছি, তার আলোকেই সীমানা প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আগের দিন নিষেধ করা সত্ত্বেও পরদিন তারা আরও সীমা বাড়িয়ে নিয়ে সীমানা প্রাচীর তুলছিলেন, যা তারা পারেন না।'

তিনি বলেন, খাস জমি হলেও জেলা প্রশাসক এককভাবে এ জমি বিদ্যালয়কে বরাদ্দ দিয়েছেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া তা তিনি পারেন না। আর ২০০৯ সালের উচ্চ আদালতের এক রায়ের পর নদীতীরবর্তী খাস জমি আর কাউকে বরাদ্দের কোনো সুযোগ নেই। অথচ ২০১২ সালে এ বরাদ্দ দেওয়া হয়।

একেএম আরিফ উদ্দিন সমকালকে বলেন, অভিযানকালে কারও সঙ্গে কোনো দুর্ব্যবহার করা হয়নি। পুরো বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।