কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করবে বিএনপি

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯

কামরুল হাসান

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ত্বরান্বিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন দলটির নেতারা। তারা চাইছেন, এ ইস্যুতে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তও তুলে ধরছেন তারা, যাতে পুনর্নির্বাচনের দাবির যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা যায়। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থানরত কূটনীতিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে এসব বিষয় আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে চাইছে বিএনপি। এ সংক্রান্ত আমন্ত্রণপত্রও প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, গত শনিবার বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদমাধ্যমকে জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ গুম-খুন ও ধর্ষণ বিষয়ে কূটনীতিকদের অবগত করা হবে। তবে কবে বৈঠক হবে, তা জানাননি তিনি।

খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে অন্তত তিনটি বৈঠক করেছেন বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের দায়িত্বশীল জ্যেষ্ঠ নেতারা। এগুলোর মধ্যে দীর্ঘ বৈঠকটি ছিল ভারতের হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাশের সঙ্গে। পরে অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। এসব বৈঠকে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাম্প্রতিক নির্বাচন-সংক্রান্ত প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয়। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতেও বিএনপির একটি পৃথক উইং কাজ করছে।

গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্নেষণ করে সুজন জানিয়েছে, ৩০০টি আসনের ৪০ হাজার ১৫৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, ৯৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ৩৫৮টি কেন্দ্রে ও ৯৬ শতাংশ ভোট পড়েছে ৫১৬টি কেন্দ্রে। ৭৫টি আসনে ৫৮৭টি কেন্দ্রের সব বৈধ ভোট পড়েছে একটি প্রতীকে। এর মধ্যে ৫৮৬টিতে সব ভোট পেয়েছে নৌকা প্রতীক। একটিতে পেয়েছে ধানের শীষ- সুজনের মতে যা কোনোক্রমেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও সংবাদমাধ্যম বিবিসির নির্বাচনী বিশ্নেষণকেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি।

এসব সংস্থার প্রতিবেদনের পাশাপাশি বিএনপির উদ্ঘাটিত নির্বাচন-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্তও সংযুক্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট দেওয়া মৃত ভোটারদের তালিকা, বিদেশে রয়েছেন অথচ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে এমন ভোটারদের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি আসনের নির্বাচনী ফলাফলকে বিশ্নেষণ করে কূটনীতিকদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের একজন সদস্য বলেন, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে তারা খুব দ্রুত বৈঠক করতে যাচ্ছেন। বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেবেন তারা। পাশাপাশি নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে সুজনের প্রকাশিত প্রতিবেদন ছাড়াও দলীয়ভাবে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের বিশ্নেষণও তুলে ধরবেন। এ লক্ষ্যে দেশের প্রত্যেক নির্বাচনী আসনে তথ্য সংগ্রহ করতে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।

বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের প্রধান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে প্রত্যেক গণতান্ত্রিক দেশ ও বন্ধু

দেশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হয়, সম্পর্ক রাখতে হয়। তাই তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় মতবিনিময় হয়। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি, অর্থনীতি ও মানবাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে যা হয়েছে, এখন তা প্রকাশ হতে চলেছে।

এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিকভাবেও তৎপরতা শুরু করেছে বিএনপি। গত বুধবার যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের মার্লবোরো হাউসে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে লর্ড কার্লাইলের নেতৃত্বে তার মুক্তির বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার শুরু হয়। ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইল বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী। গত বছর তিনি খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনি লড়াই করতে বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন। ভিসা না পেয়ে ভারতের নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনের চেষ্টা করে আলোচনার জন্ম দেন। ভারত তাকে সংবাদ সম্মেলন করতে না দিয়ে তখন ফেরত পাঠিয়েছিল।

লর্ড কার্লাইল দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিযোগ করে আসছেন, খালেদা জিয়াকে সাজানো মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে হেনস্তা করা হচ্ছে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সংগঠিত বিভিন্ন প্রচার কর্মসূচিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ নেতা অ্যানথিয়া ম্যাকলিনটায়ার, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ফিল বেনিয়ন এমইপি, লেবার পার্টির এমপি খালিদ মাহমুদ এবং অস্ট্রেলিয়ার লিবারেল পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্রুস এডওয়ার্ডসহ বিভিন্ন দেশের অনেক রাজনীতিক ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বও অংশ নিচ্ছেন।