সৌরবিদ্যুতে বদলে গেছে গ্রামীণ কৃষি ও অর্থনীতি

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের ঘরবাড়িতে কুপি-হারিকেনের আলোতে পড়াশোনা বা অন্য কাজকর্ম সারার ঘটনা এখন অনেকটাই স্মৃতি। সন্ধ্যা নামার সঙ্গেই গ্রামীণ হাটবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার রীতিও এখন শুধু গল্প। প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর রাতের সেই আঁধার সরিয়ে আলোকিত করেছে সৌরবিদ্যুৎ। বাড়িঘর ও সেচে এই বিদ্যুতের ব্যবহার বদলে দিয়েছে কয়েক কোটি মানুষের জীবন। ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে গ্রামীণ কৃষি ও অর্থনীতিতে। এর সঙ্গে পরিবেশবান্ধব বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট এবং উন্নত চুলা স্বাচ্ছন্দ্য ও সুখ এনেছে গ্রামীণ পারিবারিক জীবনে।

জ্বালানি সংকটের এ দেশে বিচ্ছিন্ন ও প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ-জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছিল সরকার ও সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলো। অবকাঠামো, কারিগরি দক্ষতা ও অর্থায়নের সেই কঠিন পথ পাড়ি দিতে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এ বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৭ সালে গঠিত হয়। তবে ২০০৩ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু বা সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন শুরু হলে সৌরবিদ্যুতায়ন পায় বড় জোর ও গতি। সৌরবিদ্যুতের আলোয় গ্রামের বাড়িতে পড়াশোনা, টেলিভিশন দেখা এবং মোবাইল ফোন রিচার্জ চলে। সৌর সেচ পাম্পের ফলে বেড়েছে কম খরচে বেশি ফসল উৎপাদন। মিনি-গ্রিডের ফলে গ্রামীণ বাজারসহ বড় এলাকা থাকে আলোকিত। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য পেয়েছে নতুন প্রাণ।

বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত অবকাঠামো উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রকল্প-কর্মসূচিতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেয় ইডকল। প্রতিষ্ঠানটির নবায়নযোগ্য শক্তি কর্মসূচির অধীনে এ পর্যন্ত ৪১ লাখ ৪০ হাজার সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ আলোকিত হয়েছে বিপুল সংখ্যক পরিবার এবং উপকৃত হয়েছে দুই কোটির বেশি মানুষ। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনের রেকর্ড এখন বাংলাদেশের। পাশাপাশি ১ হাজার ১৮৬টি বড় আকারের সৌর সেচ পাম্প এবং ২৪টি সোলার মিনি-গ্রিড গ্রামীণ কৃষি, বাজার ও অর্থনীতিতে এনেছে ইতিবাচক বড় পরিবর্তন। ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিতকরণের সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ইডকলের প্রকল্পগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

এ প্রসঙ্গে ইডকলের ভাইস প্রেসিডেন্ট (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) নাজমুল হক ফয়সাল বলেন, সৌর সেচ পাম্প ব্যবহারের ফলে ডিজেলের ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি ফসল উৎপাদনে খরচ কমেছে। মিনি-গ্রিডের ফলে হাট-বাজারসহ বড় এলাকা আলোকিত হয়ে অর্থনীতি

বড় হচ্ছে। সোলার হোম সিস্টেমের কারণে গ্রামাঞ্চলে পড়ূয়া ছেলেমেয়ের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীর পাসের হার বেড়েছে ও ঝরে পড়ার হার কমেছে। সোলার স্ট্রিট লাইটের কারণে গ্রামীণ সড়ক আলোকিত হচ্ছে। এর ফলে নিরাপদে পথচলা নিশ্চিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে সৌরবিদ্যুতের বহুমুখী ব্যবহারে নীরব বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে গ্রামীণ জনজীবন ও অর্থনীতিতে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, সরকার ২০১৪-১৫ অর্থবছরে স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানা, কমিউনিটি ক্লিনিক, হাট-বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবনসহ জনপরিসর এবং দুস্থ পরিবার পর্যায়ে সোলার প্যানেল ও বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের জন্য টিআর-কাবিটা প্রোগ্রামে বরাদ্দ বাজেটের ৫০ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত এর বেশিরভাগ কাজ সংসদ সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসন দিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে কারিগরি বোঝাপড়া ও অভিজ্ঞতার অভাবে এবং মনিটরিং না থাকায় তা তেমন সাফল্য পায়নি। পরে ২০১৬ সালে এ কাজে যুক্ত হয় ইডকল। যদিও শুরুতেই ইডকল এবং এর পার্টনার সংগঠনগুলো (পিও) এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।

ইডকল এবং পিওগুলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের টিআর/কাবিটার আওতায় যুক্ত হওয়ার পর ফের গতি আসে। ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত টিআর/কাবিটার আওতায় ৭ লাখ ১১ হাজার ৫৯টি সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়। সোলার স্ট্রিট লাইট এবং বড় সোলার সিস্টেম বসে যথাক্রমে ১ লাখ ৭ হাজার ৩২টি এবং ২৪ হাজার ৪৭১টি।

ইডকল সূত্র জানায়, শুধু সৌরবিদ্যুৎ নয়; পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৪৯ হাজার ৫০৫টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেছে ইডকল। এর মধ্যে ৮৫টি টিআর-কাবিটার আওতায়। উন্নত চুলা বসেছে ১৬ লাখ ৬০ হাজারটি, যার মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার উন্নত চুলা। টিআর-কাবিটা কর্মসূচির অধীনে গ্রাহকসেবা নিশ্চিতকরণে ইডকলের একটি কলসেন্টার রয়েছে। এ কার্যক্রম তদারকিতে প্রতি বছর প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে ইডকলের। এ ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যে সার্ভিস চার্জ দেওয়ার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অনুরোধ জানানো হয়।