পাটুয়াটুলীতে ভবনধসে দু'জন নিহত অসহায় পরিবারটির এখন কী হবে

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

ষাট বছর বয়সী জাহিদ আলী বেপারী ছিলেন ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার আয়ও আহামরি কিছু ছিল না। ফুটপাতে কলা বিক্রি করে আর কত টাকাইবা পাওয়া যায়। তবু সেই সামান্য আয়েই এতদিন চলত সংসার, ছেলেমেয়ের পড়ালেখা। ভবনধসে তার করুণ মৃত্যুর পর এখন স্বজনের কাছে শোকের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ভবিষ্যতের চিন্তা। কীভাবে চলবে তাদের জীবন? খাবার জুটবে কোথা থেকে?

পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর ছয় নম্বর লেনের জরাজীর্ণ একটি ভবনে থাকতেন জাহিদ ও তার ছেলে শফিকুল ইসলাম বেপারী। ভবনটি ধসে পড়ার পর বুধবার গভীর রাতে ধ্বংসস্তূপ থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। গতকাল বৃহস্পতিবার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) মর্গে ময়নাতদন্তের পর লাশ দুটি স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে ভবনধসে মৃত্যুর ঘটনায় জুয়েল নামে একজনকে অভিযুক্ত করে মামলা করেছেন নিহত জাহিদের স্ত্রী হালিমা বেগম। কোতোয়ালি থানার ওসি সাহিদুর রহমান সমকালকে বলেন, জুয়েল প্রশাসনের কাছ থেকে ভবনটি লিজ নিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে দু'জনকে প্রাণ হারাতে হতো না। অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

জাহিদের স্ত্রীর ভগ্নিপতি মহব্বত জান বিশ্বাস জানান, নিহতের চার ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় আয়েশা স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়ে। তার ছোট ছেলে ১৫ বছরের শফিকুল চার-পাঁচ বছর ধরে ঢাকায় বাবার কলার ব্যবসায় সহায়তা করত। ছোট দুই ছেলে ইয়ার হোসেন বেপারী ও খলিল বেপারী এবং স্ত্রী হালিমা বেগম গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বাজিতপুরে থাকেন। তারা কেউই কোনো আয় করেন না। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হালিমা ঢাকায় ছুটে আসেন। স্বামী-সন্তানের লাশ দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। গতকাল বিকেলে লাশ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। রাতেই লাশ দাফন করার কথা।

জাহিদের ভাই আরজ আলী বেপারী জানান, একটি মাত্র ঘটনায় পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে গেছে। একেবারেই পথে বসার উপক্রম হয়েছে তাদের। কোনো সঞ্চয় বা জমিজমা নেই। সাহায্য করার

মতো আত্মীয়স্বজনও নেই। এ পরিস্থিতিতে সরকার বা সংশ্নিষ্টদের আর্থিক সহায়তা পেলে তারা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারবে।

স্বজনরা জানান, জাহিদের রেখে যাওয়া নয় হাজার ৭০২ টাকাই এখন পরিবারটির শেষ সম্বল। ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর একপর্যায়ে এই টাকা পান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। পরে তারা সেই টাকা কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। টাকাগুলো নিহত জাহিদের বলে ধারণা করা হয়। সেগুলো তার পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেয় পুলিশ। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কলার কাঁদিও পাওয়া গেছে। পরদিন বিক্রির জন্য মঙ্গলবার রাতে সেগুলো কিনে রেখেছিলেন বাবা-ছেলে। মূলত এগুলো পাওয়ার পরই ভবনধসের সময় ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতির শঙ্কা জোরালো হয়।

মঙ্গলবার রাতের কোনো এক সময়ে ধসে পড়ে পাটুয়াটুলীর পরিত্যক্ত ভবনটি। আশপাশের ভবনের বাসিন্দারা বুধবার সকালে ঘটনাটি জানতে পারেন। সেদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাবা-ছেলে কলার দোকান না বসানোয় পরিচিত অন্য ব্যবসায়ীদের সন্দেহ হয়। মোবাইল ফোনে কল করে বন্ধ পাওয়ায় তারা যান ঘটনাস্থলে। সেখানে জরাজীর্ণ ভবনটির ধ্বংসস্তূপ দেখে তারা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে বিষয়টি জানান।

ফায়ার সার্ভিস কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার এরশাদ হোসেন সমকালকে জানান, বুধবার দুপুরে খবর পাওয়ার পর তাদের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধনের নেতৃত্বে তিনটি ইউনিট গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। রাত ৮টার দিকে ধ্বংসস্তূপে একটি মৃতদেহের একাংশ দেখা যায়। জঞ্জাল সরিয়ে লাশটি বের করে আনতে আরও প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লেগে যায়। সেই লাশটি ছিল জাহিদের। এর পাশেই পাওয়া যায় তার ছেলে শফিকুলের লাশ। বাবা-ছেলের লাশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে উদ্ধার অভিযান শেষ করে ফায়ার সার্ভিস।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অঞ্চল-৭ এর অথরাইজড অফিসার নূর আলম গতকাল জানান, ২০০ বছরের পুরনো পরিত্যক্ত ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে নোটিস টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার পরও তারা দু-একজন সেখানে থাকতেন। ভবনটি বর্তমানে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।