আগামী বছরই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯

সাব্বির নেওয়াজ

আগামী বছর থেকে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে 'সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা' চালুর বিষয়ে একমত হয়েছেন উপাচার্যরা। এজন্য নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করবেন তারা। এ পদ্ধতি চালু হলে শিক্ষার্থীদের একটিমাত্র ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পৃথক পৃথক পরীক্ষায় আর অংশ নিতে হবে না। এতে তাদের ভোগান্তি কমবে এবং অর্থ সাশ্রয় হবে। এবছর শুধু দেশের সাতটি কৃষি-সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে একক ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন 'বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদে'র স্ট্যান্ডিং কমিটির ২৬০তম সভায় সমন্বিত পরীক্ষা নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কামাল উদ্দিন আহম্মেদ।

ভর্তিচ্ছুদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা চালু করার। এ বিষয়ে এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সব বিশ্ববিদ্যালয়কে গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনীহার কারণে তা চালু করা যাচ্ছিল না। বিশেষ করে ভর্তি পরীক্ষার ফরম বিক্রি বাবদ কোটি কোটি টাকার আয় ছাড়তে নারাজ ছিল বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়।

সর্বশেষ গত ১৭ জুলাই এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছিলেন, তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর জন্য। তারা আশা করছেন, এ পদ্ধতি চালু করতে সফল হবেন। মন্ত্রীর ঘোষণার একদিনের মধ্যে উপাচার্যরা এ বিষয়ে একমত হলেন। তবে প্রস্তুতি না থাকায় এ বছরই তা চালু করা যাচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবুল কাশেম সমকালের কাছে আগামী বছর থেকে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রস্তাব ছিল 'গুচ্ছভিত্তিক' ভর্তি পরীক্ষা চালুর। তবে সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, গুচ্ছভিত্তিক নয়, আগামী বছর থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য 'অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা' চালু করা হবে। এতে তিনটি মাত্র পরীক্ষা নেওয়া হবে। বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও

মানবিক বিভাগের জন্য তিনটি পৃথক পরীক্ষা তিন দিনে অনুষ্ঠিত হবে। ছাত্রছাত্রীরা তাদের বাড়ির নিকটবর্তী যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বসেই ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবেন।

গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষা হলে সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি, সব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি, সমমানের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হতো। তবে উপাচার্যরা অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার বিষয়েই একমত হয়েছেন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির আহ্বানের পর দীর্ঘদিন ধরেই অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা চালুর বিষয়ে তাদের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল। তবে নানা কারণে তা চালু করা যায়নি। এ বছর জোরেশোরে এ দাবি উঠেছে। ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজি হলেও বড় ও পুরনো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর এ ব্যাপারে কোনো মতামত দিচ্ছিল না। হ্যাঁ/না কোনো কিছুই বলছিল তারা। অধ্যাপক আবুল কাশেম বলেন, তবে বৃহস্পতিবার উপাচার্যদের সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী বছর থেকে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন ভর্তি পদ্ধতি চালু হবে। এজন্য এখন থেকেই উপাচার্যরা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করবেন।

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা প্রবর্তন-সংক্রান্ত উপাচার্য পরিষদের কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, তারা একমত হয়েছেন অভিন্ন পরীক্ষা নিতে। আগামী বছর থেকেই তা কার্যকর হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার তৈরিসহ আনুষঙ্গিক প্রস্তুতির জন্য সময়স্বল্পতার অভাবে ইচ্ছা থাকলেও এবার তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

জানা গেছে, পাঁচটি কৃষি এবং দুটি কৃষি-সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের ব্যাপারে পরিষদের সভায় একমত পোষণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে- ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গুচ্ছে আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তারা দ্বিমত প্রকাশ করে বেরিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

সভা সূত্র জানায়, এ বছর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতির এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেবে। পর্যায়ক্রমে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। উল্লিখিত বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৭টি বিভাগ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোতে মেধা ও পছন্দভিত্তিক শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে। ভর্তিচ্ছু একজন শিক্ষার্থী কোন কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দেবে, তাও তাদের পছন্দের ভিত্তিতে ঠিক করা হবে। এখন কোন প্রক্রিয়ায় ভর্তির আবেদন নেওয়া হবে, ফি কত টাকা হবে ইত্যাদি বিষয়ে উপাচার্যদের মধ্যে আলোচনা চলছে। আগামী ২৯ জুলাই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ সূত্র জানিয়েছে, গত বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি গুচ্ছভিত্তিতে ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে বিস্তারিত প্রতিবেদন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পেশ করেছে। তাতে একাধিক বিকল্প প্রস্তাব আছে। ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে যেসব গুচ্ছবদ্ধ করার কথা আছে সেগুলো হচ্ছে- কৃষি, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদের সভাপতিত্বে পরিষদের সভায় গতকাল আরও অংশ নেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহাম্মেদসহ ২৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা।

এদিকে শাবি প্রতিনিধি জানান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) প্রথম বর্ষ স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত বুধবার একাডেমিক কাউন্সিলের ১৫৬তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।