সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে টানা ১৪ দিন চলা ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাঁচ লাখ ২৮ হাজার ৭২৫ জন। এতে জেলার ১৪ উপজেলার ১৪৮টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে তিনজন। আহত হয়েছেন অনেকে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, ফটিকছড়িসহ আরও কয়েকটি এলাকার কয়েকশ' গ্রাম পানির নিচে এখনও। ১৯৯৭ সালের পর এবারই অনেক বেশি এলাকা প্লাবিত হয়েছে চট্টগ্রামে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এ পর্যন্ত ৬৪৬ টন চাল ও নগদ সাড়ে ১৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে, সঙ্গে ৫ হাজার ৭৬০ প্যাকেট শুকনো খাবারও। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ও ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহযোগিতায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২৮৪টি মেডিকেল টিম ও কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে সার্বিক বিষয় তদারকিতে। চট্টগ্রামে চলমান থাকা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে ক্ষতির এমন চিত্র উঠে এসেছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলার পাশাপাশি টানা ভারি বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে মহানগরের চারটি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৪ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফটিকছড়িতে। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এর পার্শ্ববর্তী উপজেলা সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন, রাঙ্গুনিয়ার ১৫টি, রাউজানের ১৪টি, হাটহাজারীর ১৩টি, আনোয়ারার ১১টি, পটিয়া ও মিরসরাইয়ের ১০টি করে, সীতাকুণ্ডের ৯টি, চন্দনাইশের ৮টি, বোয়ালখালীর ৬টি এবং কর্ণফুলী ও লোহাগাড়ার ৫টি করে ইউনিয়নের মানুষ। উপজেলাগুলোর ১১টি পৌরসভাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনও অনেক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। জানা গেছে, দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় ত্রাণ পাঠাতে ৯০০ টন চাল ও নগদ ১৮ লাখ টাকার বরাদ্দ মিলেছে। এই বরাদ্দ থেকে এরই মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ৬৪৬ টন চাল ও সাড়ে ১৩ লাখ টাকা। শুকনো খাবারের পাঁচ হাজার ৭৬০টি প্যাকেটও বিতরণ করা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'টানা ১২ দিনের দুর্যোগে পাঁচ লাখ ২৮ হাজার ৭২৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সব চাহিদা পৌঁছে দিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে উপজেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন একযোগে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা অনেক হলেও আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী

মজুদ আছে। এরই মধ্যে ত্রাণ ও নগদ টাকা বিতরণ করা হলেও বর্তমানে ২৫৪ টন চাল ও সাড়ে চার লাখ টাকা মজুদ আছে। সেই সঙ্গে মজুদ আছে দুই হাজার ৬৮০ প্যাকেট শুকনো খাবারও। যে কোনো বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছি আমরা।'

জানা গেছে, ফটিকছড়িতে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হালদার বেড়িবাঁধে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে এ পর্যন্ত দু'জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ১৮ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার প্রায় অর্ধশত গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সায়েদুল আরেফিন বলেন, 'অর্ধশতাধিক গ্রামের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। বৃষ্টির সঙ্গে পানি বাড়ার কারণে বেশ কিছু নতুন এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ৩৫ টন চাল, ৪০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং এক লাখ টাকা দুর্গতদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে।' উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লিটন নাথ বলেন, 'ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে মাঠে থাকা প্রায় ৩৫০ হেক্টর আমন বীজতলা। এ কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিরূপ প্রভাব পড়বে।' উপজেলার কেওচিয়া ইউনিয়নের সামিয়ার পাড়ার বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, '১৯৯৭ সালের পর এবারের বন্যায় অনেক বেশি এলাকা অতিরিক্ত পানিতে প্লাবিতে হয়েছে। এর আগে ১৯৬১ সালে বন্যা হয়েছিল।'

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, 'অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় ও ভূমিধসজনিত সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় টিম গঠন ও কন্ট্রোল রুম রয়েছে। জেলার প্রত্যেক উপজেলায় পাঁচটি করে মোট ৭০টি, প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ২০০টি, আরবান ডিসপেনসারি ও জেনারেল হাসপাতালসহ ২৮৪টি মেডিকেলে টিম কাজ করছে। সরকারি সব চিকিৎসা কেন্দ্রের চিকিৎসকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব সেবা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।'

জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার তাহমিলুর রহমান বলেন, 'পাহাড় কেটে ও পাদদেশে বসতঘর বানিয়ে ভাড়া দিয়েছিল কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী লোক। ইতিমধ্যে অভিযান পরিচালনা করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা শতাধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। অনেক অবৈধ ঘরও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইন কাটা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকায় ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো গেছে।'