'বাচুরটাই মোর ভবিষ্যত আছিল'

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯

নাজমুল হুদা পারভেজ, চিলমারী (কুড়িগ্রাম)

'বাচুরটাই মোর ভবিষ্যত আছিল'

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে বসতবাড়ি, মাঠ-ঘাট। গবাদিপশুর তাই ঠাঁই হয়েছে মাচানে। কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে তোলা ছবি - সমকাল

'বাচুরটাই মোর ভবিষ্যত আছিল। ভগমান মোর এত বড় ক্ষতি করিল ক্যানে?' কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার বন্যাকবলিত রমনা ইউনিয়নের জোড়গাছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন বাঁধে একটি টিনের ছাপড়ার নিচে মৃত বাছুর সামনে নিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন প্রৌঢ়া রাধা রানী।

এমন করুণ দৃশ্য দেখে তার দিকে এগিয়ে গেলে তিনি জানান, নদীর পাড়ে তার সামান্য বসতভিটা আর একটি গাভী আছে। ছয় মাস আগে গাভীটির একটি বাছুর হয়। বাড়িতে শুকনো কোনো জায়গা না থাকায় গাভীসহ বাছুরটি পানি ও কাদামাটিতে ছিল। হঠাৎ বাছুরটি অসুস্থ হয়ে পড়লে রাধা রানী অনেকের কাছে নৌকা বা ভেলা নিয়ে আসার অনুরোধ করেও সাড়া পাননি। অবশেষে নিজের বাছুরটি কাঁধে করে পানিতে ভিজে বাঁধে পৌঁছে দেখেন সেটি মারা গেছে।

রাধা রানীর মতোই গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে অন্য বানভাসিরাও। চিলমারীর চরাঞ্চলের মানুষের একমাত্র সম্বল গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি। পুরো চরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় মানুষের সঙ্গে গৃহপালিত পশুর থাকা ও খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। মারাও যাচ্ছে বহু গবাদিপশু।

এদিকে উপজেলা পশুসম্পদ অফিসে গিয়ে তাদের দেওয়া ১৬ জুলাইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গরু-মহিষ ও ছাগল মৃতের সংখ্যা শূন্য লেখা রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অফিসটিতে ১১ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন উপস্থিত আছেন। ভিএফএ মো. আব্দুল হক মণ্ডল জানান, বর্তমানে গবাদিপশুর ফুডপয়জনিং হচ্ছে। ফলে পাতলা পায়খানা ও জ্বর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলেও জনবলের অভাবে ঠিকমতো কাজ করা যাচ্ছে না।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী পয়েন্টে পানি ৭ সেন্টিমিটার কমে বর্তমানে বিপদসীমার ১২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে উপজেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে অন্তত ৩-৪ ইঞ্চি পানি বেড়েছে। পানির স্রোতে একটি ব্রিজ ও একটি রাস্তা ধসে গিয়ে নতুন করে ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে উপজেলার ৬ ইউনিয়নে মোট ৩০ হাজার ৯৩৯টি পরিবারের এক লাখ ৪৭ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে পুকুরের মাছও। উপজেলার ৩টি চরাঞ্চলীয় ইউনিয়নের মানুষ খোলা আকাশের নিচে, বাড়ির চালের ওপর মাচা পেতে, নৌকার

ওপর, ভেলার ওপরসহ বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যা ও আর্থিক সংকটের কারণে দরিদ্র দিনমজুর ও খেটেখাওয়া মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছে।

গাইবান্ধায় ট্রেন চলাচল বন্ধ :গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ত্রিমোহিনী থেকে বোনারপাড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় রেললাইনের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত অব্যাহত থাকায় বৃহস্পতিবারও লালমনিরহাট-সান্তাহার রুটে গাইবান্ধার ত্রিমোহিনী রেলস্টেশন থেকে বোনারপাড়া জংশন পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের কদমেরতল থেকে ফকিরপাড়া পর্যন্ত এবং গাইবান্ধা-ফুলছড়ি-সাঘাটা সড়ক, গাইবান্ধা-বালাসীঘাট সড়ক, গাইবান্ধা-বোনারপাড়া সড়ক এখন হাঁটু সমান পানিতে নিমজ্জিত। ফলে সড়কগুলোতে সব ধরনের যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে গাইবান্ধা শহরের বিভিন্ন সড়কে হাঁটু পানি। অধিকাংশ এলাকার বসতবাড়িতে পানি উঠেছে।

এদিকে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গতকাল বিকেলে বন্যা পরিস্থিতির ওপর এক প্রেস ব্রিফিং করা হয়। এতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আলমগীর কবির ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেবুন নাহার জানান, বন্যায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি, সাদুল্যাপুর ও সদর উপজেলার একটি পৌরসভাসহ ৩৭টি ইউনিয়নের ২৫৩টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা এক লাখ চার হাজার ৩৪০টি ও লোকসংখ্যা তিন লাখ ৯৭ হাজার ৯৮ জন। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা ৩৯ হাজার ১৪২টি। আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১৬৬টি। এতে ৭১ হাজার ২৪ জন আশ্রয় নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩০৯টি। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির পরিমাণ ৯ হাজার ৮২১ হেক্টর। এ ছাড়া দুই হাজার ৯৪১টি পুকুরের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫৮৫ টন চাল ও ৯ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ৫৫০ কার্টন শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

সুন্দরগঞ্জে ৬৪ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ :সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি জানান, বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় উপজেলার ৬৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৪৭টি এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১৭টি। টানা ১০ দিন পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হারুন-উর-রশিদ জানান, চরাঞ্চলে অবস্থিত ২১টিসহ মোট ৪৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন মণ্ডল জানান, মাধ্যমিক স্তরের বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় কেন্দ্র চালু করায় পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোলেমান আলী জানান, বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। পানি সরে গেলে পাঠদান চালু করা হবে।