ঈশ্বরদীতে রেলের জায়গায় বিএনপি নেতার রিসোর্ট

জমি বিক্রিতে জড়িত আওয়ামী লীগ নেতারাও

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০১৯      

এবিএম ফজলুর রহমান, পাবনা ও সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী

পাবনার ঈশ্বরদীতে রেলের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু'দলেরই স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। বিএনপির এক নেতা রেলের জায়গা দখল করে গড়ে তুলেছেন রিসোর্ট। একেবারে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ধারী ক্ষমতাধর কিছু লোক যোগসাজশ করে রেলের জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন। বেদখল জমি

ফিরে পেতে বছরের পর বছর মামলা চালাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তবে জমি থেকে যাচ্ছে দখলদারদের কব্জায়।

ঈশ্বরদী উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আকরাম আলী খান সঞ্জু রেলের ৩৩ বিঘা জমি দখল করে 'পাকশী রিসোর্ট' ও 'খান মঞ্জিল' নামে দুটি স্থাপনা নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্থাপনা দুটির কিছু অংশ উচ্ছেদ করা হয়। তবে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ হওয়ার পরপরই সংস্কার করে আবার চালু করা হয় পাকশী রিসোর্ট ও

খান মঞ্জিল।

সারাদেশে রেলের কার্যক্রম চারটি বিভাগে বিভক্ত। যার একটি

পাকশী। এ বিভাগে রেলের প্রায় দুই হাজার ১৯৪ একর জমি রয়েছে। রেলের নথি অনুযায়ী, ১৪ একর জমি বেদখল হিসেবে চিহ্নিত। তবে সরেজমিন দেখা যায়, এর কয়েকগুণ জমি বেহাত হয়েছে। ঈশ্বরদীর পাকশী ও সাঁড়া ইউনিয়নে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় রেলের জমি অবৈধভাবে দখলে রেখেছে স্থানীয়রা। এসব জমি কেনাবেচাও চলছে।

সাঁড়ার ইপিজেড সংলগ্ন এলাকার নতুন বাসিন্দা ছায়েদ আলী মোল্লা সমকালকে জানান, পদ্মা নদীর ভাঙনে ভেড়ামারা তীরে তার ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। ফলে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে এসে জমি কিনে বসবাস শুরু করেন। জিয়া নামে স্থানীয় এক দখলদারের কাছ থেকে প্রতি কাঠা ১৩ হাজার টাকা দরে তিন কাঠা জমি কিনেছেন। তবে এই জমি আসলে রেলওয়ের।

পদ্মা নদীর গাইড ব্যাংকে রেলওয়ের জায়গায় ঘর তুলে বাস করছেন আব্দুল গণি মিয়া। তবে জমির কোনো কাগজপত্র নেই তার কাছে। আরেক তথাকথিত জমি ক্রেতা রুস্তম সরদার জানান, পাকশী, সাঁড়া, সিবেলহাট ও সাঁড়াগোপালপুরের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা রেলের জমি বিক্রির মধ্যস্থতা করছেন। এসব জমি কেনাবেচার কাগজপত্র নেই।

স্থানীয়রা জানান, পদ্মা নদীর গাইড ব্যাংক এলাকায় অবৈধভাবে রেলের জমি বিক্রিতে জড়িত রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দেওয়া স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। তারা স্থানীয় দখলদারদের মাধ্যমে ১৫০ টাকার স্ট্যাম্পে প্রতি কাঠা ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। নুরু মিয়া নামে এক ব্যক্তি জানান, স্থানীয় আমজাদ হোসেনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা কাঠা দরে তিন কাঠা জমি কিনে বাড়ি করেছেন তিনি।

পাকশী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অবৈধভাবে রেলের জমি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িতদের এলাকার সবাই চেচেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার কারও সাহস নেই। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পাকশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছাইফুল আলম বাবু মণ্ডল বলেন, রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে কিছু মানুষ রেলের জমি বিক্রি করছে।

পাকশী ছাড়াও পাবনার ঈশ্বরদীতে ৫০ বিঘারও বেশি জমি বছরের পর বছর দখল করে রেখেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। দখল ধরে রাখতে 'মামলার ফাঁদ' পেতেছেন তারা।

সরেজমিন দেখা যায়, পদ্মা নদীর গাইড ব্যাংক ও ঈশ্বরদী ইপিজেডের প্রাচীর ঘেঁষে রেলের জায়গায় গড়ে উঠেছে তিন শতাধিক ঘরবাড়ি। হঠাৎ করে এ বসতি গড়ে ওঠায় এলাকাটি 'হঠাৎ পাড়া' নামে পরিচিত। ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন এলাকায় ১০ বিঘারও বেশি জমি অবৈধ দখলদারদের কব্জায় রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।

কৃষি ও মৎস্য চাষের কথা বলে বৈধভাবে ইজারা নেওয়া জমি ব্যবহার হচ্ছে অবৈধভাবে। শহরের পাতিবিল, বাস টার্মিনাল, ত্রিকোনা বিশাল খাদ, রেজাউল মৎস্য খামার ও টিপু সুলতান রোডে দোয়েল সিমেন্ট ফ্যাক্টরির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জমি নিয়ে মামলা চলছে রেলওয়ের।

কিছু মামলা চলছে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় দখলকারীরা রেলের জমি ইচ্ছামতো ব্যবহার করছেন। পাকশী বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জমি নিয়ে অন্তত ২০টি মামলা চলছে। তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পাকশী রিসোর্ট উচ্ছেদের কাজ শুরু হয়। তবে রেল বিভাগের তৎকালীন সচিবের 'মৌখিক নির্দেশে' উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত হয়।

বিদেশে থাকা আকরাম আলী খান সঞ্জু কেনা জমিতে রিসোর্ট করেছেন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ১৯৪১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রেলের ৫০ একর জমি পাবনা কালেক্টর খবির উদ্দিন ও ভগবান দাসের কাছে নিলামে বিক্রি করেন। তাদের কাছ থেকে আব্দুল মান্নান খান ১১ দশমিক ৬ একর জমি কেনেন। পরে ক্রয়সূত্রে এই জমির মালিক হন তিনি। তিনি অভিযোগ করেছেন, রিসোর্ট নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন।

পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ভূসম্পত্তি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পাকশীর রূপপুর দিয়াড়-১২, দিয়াড় বাঘইল-২২, পাকশী-১১, বাঘইল-২৩, চররূপপুর-২১, সাঁড়া-৯ ও ঝাউদিয়া-৮ মৌজায় রেলের দুই হাজার ১৯৪ দশমিক ৮ একর জমি রয়েছে। লালন শাহ সেতু নির্মাণকালে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে সাত একর, ইপিজেড নির্মাণের সময় বেপজার কাছে ৩৬ একর জমি হস্তান্তর করে রেল।

পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা ইউনুছ আলী জানান, রেলের জমি দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরও স্থানীয় প্রভাবশালীরা আবার জমি দখল করেন।