খুলনা বিভাগীয় সমাবেশে মির্জা ফখরুল

ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে মুক্ত করতে হবে খালেদা জিয়াকে

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০১৯      

খুলনা ব্যুরো

'বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করে আওয়ামী লীগ যে অন্যায় করেছে, তা দেশের জনগণ কোনোদিন মেনে নেবে না। এ জন্য জনগণের কাছে আওয়ামী লীগকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। দেশে আজ ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।'

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনার শহীদ হাদিস পার্কে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কথা বলেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সরকারের পদত্যাগ ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে এ সমাবেশ হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু।

মেঘাচ্ছন্ন বৃষ্টিস্নাত পরিবেশে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা থেকে বিএনপি নেতাকর্মীরা এ সমাবেশে যোগ দেন। শহীদ হাদিস পার্কে স্থান না হওয়ায়

নেতাকর্মীরা আশপাশের সড়কে দাঁড়িয়ে নেতাদের বক্তব্য শোনেন। তবে হাদিস পার্কে মঞ্চের কাছাকাছি যাওয়া নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে দুই দফায় ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে বিএনপি মহাসচিব তাদের শান্ত করেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, এ দেশে একটি দল বার বার ক্ষমতায় এসে সব সময় গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে। কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চাচ্ছে। বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। বিচার পাওয়ার আশা এখন দুরাশা। এমন দেশে বাস করছি, যেখানে মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। দিনেদুপুরে আদালতের মধ্যেই কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, গণপিটুনির নামে মানুষ মারা হচ্ছে। দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আর এসবই হচ্ছে সরকারের মদদে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, প্রিয়া সাহার বক্তব্যে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও ক্ষুব্ধ এতে। কিন্তু তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আর সেই সুযোগে তিনি ভিডিওবার্তায় বলেছেন, তার বক্তব্যই নাকি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য। দেশবাসী জানতে চায়, আসলেই এটা প্রিয়া সাহার বক্তব্য না প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য।

'২০ দলীয় জোট আছে, ঐক্যফ্রন্টও আছে' :মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে দানব সরকারকে পরাজিত করতে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিলাম। একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা বলছে, বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে সমাবেশ করছে, ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিএনপি বেরিয়ে গেছে। তবে পরিস্কার ঘোষণা দিতে চাই, ২০ দলীয় জোট ঠিক আছে, ঐক্যফ্রন্টও ঠিক আছে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা সরকারকে পরাজিত করব।

তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি শুধু বিএনপি নেত্রী নন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আপসহীন নেত্রী। যিনি গণতন্ত্রের জন্য এত সংগ্রাম করলেন, স্বৈরাচারের হাত থেকে গণতন্ত্রকে মুক্ত করলেন, তাকে কারাগারে দীর্ঘকাল অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। খবর পেয়েছি, তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে সঠিক চিকিৎসাও করা হচ্ছে না। সুচিকিৎসার জন্যও তার মুক্তির দাবি জানাচ্ছি। যে গণতন্ত্রকে আওয়ামী লীগ হরণ করেছে, যে ভোটের অধিকারকে সরকার ডাকাতি করে কেড়ে নিয়েছে, সেই অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনগণ খালেদা জিয়াকে সামনে দেখতে চায়, কাছে পেতে চায়।

'মানুষ ডেঙ্গু ও পিটিয়ে মারার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে' :সমাবেশে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার যে বাজেট দিয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য জনগণের পকেট কাটা। ব্যাংক, শেয়ার মার্কেট লুটপাট করা হয়েছে। এখন মা-বোনেরা নিরাপদ নয়। বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হচ্ছে। মানুষ এখন ডেঙ্গু ও পিটিয়ে মারার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। দেশে এখন আইনের শাসন নেই, কোনো বিচার নেই।

মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার সাধারণ মানুষের চিন্তাও করছে না। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও পাটকল শ্রমিকদের মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার এখন দেউলিয়া সরকার, শুধু উন্নয়নের ঢাকঢোল বাজায়। উন্নয়ন হচ্ছে রামপালের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা সুন্দরবন ধ্বংস করবে। সরকারকে একদিন জনগণের আদালতে দাঁড়াতে হবে।

'সরকার দুদককে ব্যবহার করেছে' :বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, খালেদা জিয়াকে বিপাকে ফেলতে সরকার দুদককে ব্যবহার করেছে। সরকার এ মামলায় আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। তাই আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার জামিন হবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এ জন্য আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আন্দোলনের কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে।

'সরকারের পতনই বেশি জরুরি' :সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির চেয়ে এখন বেশি জরুরি সরকারের পতন ঘটানো। সরকারের পতন ঘটলে জিয়া এমনিতেই মুক্তি পাবেন। তিনি বলেন, এই সরকার নারীদের সম্মান রক্ষা করতে পারছে না। দেশে তাই ধর্ষণ মহামারি আকার ধারণ করেছে।

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, এই সরকার মামলাবাজ সরকার। বিএনপির কয়েক লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার মশা মারতে পারে না, পারে বিএনপি নেতাকর্মীদের মারতে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি বারবার গণতন্ত্র জবাই করেছে, আর বিএনপি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে।

সমাবেশে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মসিউর রহমান, কবির মুরাদ, যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। আরও বক্তব্য দেন বিএনপির স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, প্রকাশনা সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম হাবিব, তথ্য সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু প্রমুখ। সমাবেশ পরিচালনা করেন নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি ও জেলার সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান।