বাধাগ্রস্ত হতে পারে দ্রুত শিল্পায়ন

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

আবু কাওসার

মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার করা হলেও শিল্পের কাঁচামালে তা বহাল রয়েছে। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, আগাম কর আরোপের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। দ্রুত শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। জটিলতা তৈরি হবে বন্দরে পণ্য খালাসে। নতুন শিল্প স্থাপনে নিরুৎসাহিত হবেন ব্যবসায়ীরা। তা ছাড়া এ সিদ্ধান্ত সরকারের নীতি-সহায়তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলেছে, আগাম কর নিলেও পরে তা ফেরত দেওয়া হবে। ফলে ব্যবসার খরচ বাড়বে না, বরং কমবে।

নতুন অর্থবছরের (২০১৯-২০) বাজেটে বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিকসহ আমদানি পর্যায়ের সর্বক্ষেত্রে ভ্যাটের নামে অন্যান্য শুল্ক্ক-করের সঙ্গে ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত আগাম কর আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিল্প স্থাপনের প্রারম্ভিক ধাপ অর্থাৎ মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল এ তালিকায় ছিল। বাজেট ঘোষণার পর এ বিষয় নিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আগাম কর আরোপের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। সংশ্নিষ্টদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাজেট সংশোধন করে শিল্প স্থাপনে ব্যবহার্য মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগাম কর তুলে নিলেও কাঁচামালে তা বহাল রাখা হয়।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কাস্টমসের ট্যারিফ তালিকায় আমদানি পর্যায়ে শিল্পে ব্যবহার্য মৌলিক কাঁচামাল পণ্যের সংখ্যা ১২ শতাধিক। বর্তমানে উল্লিখিত পণ্যগুলোর ওপর কাস্টম ডিউটি বা আমদানি শুল্ক্ক ৫ শতাংশ হারে আদায় করা হয়। এর সঙ্গে অগ্রিম করসহ পণ্যভেদে অন্যান্য কর যুক্ত আছে। নতুন বাজেটে এর সঙ্গে বাড়তি ৫ শতাংশ আগাম কর বসানো হয়েছে। এতে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল আমদানির মোট কর-ভার আগের চেয়ে বেড়ে যাবে। যদিও আইন অনুযায়ী আরোপিত বাড়তি আগাম কর ফেরতযোগ্য।

এনবিআর সূত্র বলেছে, কাঁচামাল আমদানির পর যে পরিমাণ বাড়তি আগাম কর আদায় করা হবে, মাসিক ভ্যাট রিটার্ন জমা দিলে তা ফেরত বা সমন্বয় করা হবে। এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আগাম কর আরোপের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের ভ্যাট রিটার্ন

জমা দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। ফলে যারা নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন জমা দেন, তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। তবে চাপে পড়বে অসাধু ব্যবসায়ীরা। কারণ তারা ভ্যাট রিটার্ন জমা দেয় না। ফলে কোনো টাকা ফেরত পাবে না।

সূত্র বলেছে, আগাম কর আরোপের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে কাঁচামাল ব্যবহার নিশ্চিত করা। কারণ অনেকেই আছে, শিল্প স্থাপনের কথা বলে কম শুল্ক্কহারে কাঁচামাল এনে কালোবাজারে বিক্রি করে দেয়। ভ্যাট রিটার্ন জমা দিলে বোঝা যাবে,

আমদানি করা কাঁচামাল শিল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে। এসব বিবেচনা করে আমদানি পর্যায়ে আগাম কর আরোপ করা হয় বলে এনবিআরের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান। জানা যায়, যারা বাণিজ্যিকভাবে পণ্য আমদানি করে (কমার্শিয়াল ইমপোর্টার), তাদের ৯০ শতাংশই ভ্যাট রিটার্ন জমা দেয় না।

তবে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন- এটা মেনে নেওয়া যায় না। মাথাব্যথা হয়েছে, তাই বলে মাথা কেটে ফেলতে হবে- এটা কোনো সমাধান নয়। অসৎ ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

যোগাযোগ করা হলে এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন সমকালকে বলেন, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আগাম কর আরোপ করা ঠিক হয়নি। বাড়তি আগাম কর আরোপের ফলে উদ্যোক্তাদের নগদ অর্থ প্রবাহ জোগানে চাপ সৃষ্টি হবে। ব্যাংকনির্ভরতা আরও বাড়বে। ঋণের বিপরীতে সুদ গুনতে হবে বেশি। ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস পাবে। ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের দেশে রিফান্ডের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এই প্রক্রিয়ায় পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয় ব্যবসায়ীদের।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান কাঁচামাল আমদানিতে আগাম কর তুলে নেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।