'প্রভাবশালী' বাস সার্ভিসের ভাড়া বেড়েছে রাজধানীতে

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

রাশেদ মেহেদী

রাজধানীতে ভাড়া বেড়েছে প্রভাবশালীদের বাস সার্ভিসে। যাত্রীদের জিম্মি করে কয়েকটি বাস সার্ভিসে আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়াও। তবে মালিক সমিতি এখন পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাসের বিদ্যমান ভাড়া পুনর্মূল্যায়নের জন্য খুব শিগগিরই সরকারের কাছে লিখিত আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লা। বিআরটিএর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাজধানীতে বাস ভাড়া নিয়ে বিশৃঙ্খলা এবং এমনিতেই অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে এ ভাড়ার হার পুনর্মূল্যায়নের বাস্তবতা নেই। তবে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া বর্ধিত জ্বালানি মূল্য দ্বারা সমন্বয় করা হলেও হতে পারে। এদিকে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গুলশান-বনানী এলাকায় রিকশার জমা ১০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে রিকশা ভাড়াও বেড়ে গেছে এসব এলাকায়।

ভাড়া বৃদ্ধির চিত্র :সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীতে আগে থেকেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা প্রভাবশালীদের পরিবহন হিসেবে পরিচিত মনজিল পরিবহন, বিকাশ পরিবহন, ভিআইপি বাস সার্ভিস এবং শতাব্দী পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে এক লাফে ১০ টাকা করে। এ ছাড়া রাইদা পরিবহন, আর্ক পরিবহনে ভাড়া অচিরেই বাড়বে বলে আগে থেকে পরিবহনের শ্রমিক-কর্মচারীরা মৌখিকভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যাত্রীদের। তবে এবার নোটিশ টানানো হয়নি। রাজধানীর গুলিস্তান-মতিঝিল এলাকা থেকে উত্তরা-আশুলিয়া রুটে চলাচল করা মনজিল পরিবহনে (ঢাকা মেট্রো-১৪-৯৬৪৩) বাসে গত বুধবার রাত ১০টার দিকে সাতরাস্তা এলাকা থেকে উঠলে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩০ টাকা দাবি করা হয়। এ বাসে আগে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ২০ টাকা। তবে বাসে যাত্রীদের কোনো টিকিট দেওয়া হয় না। সিটিং সার্ভিস লেখা থাকলেও দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা যায়। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত ভাড়া না দেওয়ার কারণে মনজিল পরিবহনের এ বাস থেকে মগবাজার এলাকায় একজন যাত্রীকে জোর করে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে কাকরাইল এলাকা থেকে ওঠা ওই যাত্রীর কাছ থেকে ৩০ টাকা ভাড়াও রেখে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য বাসের কন্ডাক্টর এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'বনানী পর্যন্ত তার কাছে দুই চেকপোস্ট অতিক্রম করার হিসাবে ৪০ টাকা ভাড়া চাওয়া হয়। তিনি ৪০ টাকা দিতে পারবেন না বলে নিজেই নেমে গেছেন।' তাহলে ৩০ টাকা ভাড়া রাখা হলো কেন- জানতে চাইলে তিনি জানান, এখন থেকে ভাড়া ১০ টাকা করে বেশি পড়বে।

পরে বৃহস্পতিবার খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মতিঝিল থেকে উত্তরা রুটে চলাচল করা শতাব্দী পরিবহনেও আগে যেখানে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ২০ টাকা, সেখানে ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এক চেকপোস্ট থেকে আরেক চেকপোস্টের দূরত্ব হিসেবে কোম্পানির অদ্ভুত নিয়মে এ বাসে ভাড়া নেওয়া হয়। তবে যাত্রীদের টিকিট দেওয়া হয় না। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, চেকপোস্ট নিয়মের কারণে মহাখালীর যাত্রীদের চেয়ারম্যানবাড়িতে, সাতরাস্তার যাত্রীদের নাবিস্কোতে জোর করে নামিয়ে দেওয়া হয়। তবে ভাড়া সর্বনিম্ন আগে ২০ টাকা, এখন নেওয়া হচ্ছে৩০ টাকা।

একই ধরনের চিত্র দেখা যায় আজিমপুর থেকে উত্তরা ও গাজীপুর রুটে চলাচল করা দুটি বাস সার্ভিস বিকাশ পরিবহন ও ভিআইপি পরিবহনের ক্ষেত্রেও। যাত্রীরা জানান, ভিআইপি বাস সার্ভিস কয়েক মাস আগেও কাউন্টার ভিত্তিতে পরিচালিত হতো। তখন এ বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া নেওয়া হতো আজিমপুর থেকে উত্তরার দিকে যাওয়ার পথে ৫০ টাকা এবং আসার পথে ৪০ টাকা। এখন কাউন্টার তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রী নিয়ে পুরোপুরি লোকাল বাসে পরিণত করার পরও এর সর্বনিম্ন ভাড়া ৪০ টাকা। সর্বশেষ ভাড়া ১০ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে বিকাশ পরিবহনেও আগে টিকিট দিয়ে সিটিং সার্ভিস হিসেবে ভাড়া নেওয়া হতো। এখন টিকিট তুলে দিয়ে পুরোপুরি লোকাল বাসে পরিণত করার পরও সর্বনিম্ন ভাড়া যাওয়ার পথে ৪০ টাকা এবং আসার পথে ২৫ টাকা। গত বুধবার থেকে আগের চেয়ে ১০ টাকা ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব বাস সার্ভিসের কোনোটিতেই যাত্রীদের টিকিট না দেওয়ার কারণে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কোনো প্রমাণই থাকছে না। টিকিট না দিয়ে এসব বাস সার্ভিসে 'ভাড়া ডাকাতি' করা হচ্ছে বলে যাত্রীদের অভিযোগ।

অবশ্য সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর কোনো বাস সার্ভিসেই এখন টিকিট দেওয়া হয় না। তবে এই চারটি 'প্রভাবশালী' বাস সার্ভিস ছাড়া অন্যান্য বাস সার্ভিসে সর্বনিম্ন ১০ টাকা ভাড়ায় চলছে। এখন পর্যন্ত ওই চারটি বাস সার্ভিস ছাড়া অন্য বাসগুলোতে ভাড়াও বাড়েনি।

পরিবহন খাতসংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, এমনকি পরিবহন প্রশাসনের একাধিক ব্যক্তি এই প্রভাবশালী বাস সার্ভিসের মালিকানায় যুক্ত। এ কারণে এসব বাস সার্ভিস সব ধরনের সরকারি নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে গায়ের জোরে নিজেদের নির্ধারণ করা ভাড়া ও নিয়ম অনুযায়ী বাস চালাচ্ছে। এই চারটি বাস সার্ভিসের মধ্যে বিকাশ পরিবহন এবং ভিআইপি পরিবহন রাজধানীতে সর্বোচ্চ বেপরোয়া চলাচল এবং ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটানোর জন্যও কুখ্যাত।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লা বলেন, 'রাজধানীতে বেশকিছু বাস সার্ভিসে ভাড়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। কোনো সার্ভিস অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও প্রশাসনের কাছে সমিতির পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে।' তিনি বলেন, মালিক সমিতি ভাড়া বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্তই নেয়নি। তবে বর্ধিত জ্বালানি মূল্যের সঙ্গে ভাড়ার হার সমন্বয় করার জন্য খুব শিগগিরই সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হবে।

গুলশান-বনানীতে রিকশার জমা বেড়েছে :গতকাল বৃহস্পতিবার গুলশান-বনানী এলাকায় হঠাৎ রিকশা খুব কম দেখ যায়। এর কারণ হিসেবে একাধিক রিকশাচালক জানান, আগে যেখানে দৈনিক জমা ৩০০ টাকা ছিল, তা মঙ্গলবার থেকে ৪০০ টাকা করা হয়েছে। আবার বনানী এলাকার ভেতরে জে ব্লক এবং বনানী বাজার এলাকার কয়েকটি সড়কে পুলিশ রিকশা চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে গুলশান-বনানী এলাকার ভেতরে স্বল্প দূরত্বে চলাচলের জন্য রিকশার ওপর নির্ভরশীল মধ্যম আয়ের মানুষ প্রচণ্ড গরমের ভেতরে চরম দুর্ভোগে পড়েন। তবে হাতেগোনা কিছু রিকশাকে ভেতরের অন্যান্য সড়কে চলতে দেখা যায়। জমা বাড়ার কারণে রিকশার ভাড়াও আগের চেয়ে ১০ টাকা করে বেশি দাবি করতে দেখা যায় রিকশাচালকদের।