কিশোরগঞ্জে ভুল চিকিৎসা ও প্রতারণার অভিযোগ

দুই চিকিৎসকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মেডিল্যাব নামে এক প্রাইভেট ক্লিনিক মালিকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে। ফলে নষ্ট হয়ে গেছে এক নারীর গর্ভের সন্তান। এ ঘটনায় ভুল চিকিৎসার শিকার তানিয়ার বাবা আক্কাছ আলী বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন কিশোরগঞ্জ আদালতে। মঙ্গলবার ২ জুলাই মামলাটি আমলে নিয়ে ভৈরব থানার ওসিকে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে আদেশ দিয়েছেন আদালত। মেডিল্যাব হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর আলমসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে (মামলা নং ১৮২/২০১৯ ইং)। মামলার অপর দুই আসামি হলেন- হাসপাতালের মালিক ডা. জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী তামান্না ফেরদৌসী এবং চিকিৎসক ডা. হাফিজা খাতুন।

জানা গেছে, সরকারি চাকরির সুবাদে প্রায় ছয় বছর আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর। পরে ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে গড়ে তোলেন সখ্য। ফলে কর্মক্ষেত্রে দু'বছর পার না হতেই শহরের কমলপুরে মেডিল্যাব (প্রাইভেট) নামে একটি ক্লিনিক খুলে বসেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরির সুবাদে সুকৌশলে রোগীদের তার ক্লিনিকে এনে টেস্টের নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তুলেছেন একটি দালাল চক্র। একাধিক চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় চটকদার বিজ্ঞাপন বা লিফলেট বিতরণ করেন তাদের মাধ্যমে। ফলে গ্রামের সহজ-সরল মানুষ তার ফাঁদে পড়ে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে হচ্ছেন প্রতারণার শিকার। গত এক বছরে ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা ও একাধিক ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে। একবার তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জেসমিন আক্তার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার শিমুলকান্দি ইউনিয়নের মধ্যেরচর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা নাজমা বেগমের কাছ থেকে অপারেশনের নামে প্রায় ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। ছয় মাস পর ফের নাজমা বেগমের শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে। ফলে এর প্রতিকার চেয়ে নাজমা বেগম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক, জেলা

প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরে নাজমা বেগমকে নগদ ২০ হাজার টাকা দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। এর আগে কমলপুরের এক তরুণীর অ্যাপেন্ডিসাইটের অপারেশন করতে গিয়ে ভুলে তরুণীর সন্তান জন্ম দেওয়ার থলি কেটে ফেলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাছাড়া পৌর শহরের পুলতাকান্দা গ্রামের সওদাগর জামানের শিশুপুত্রের পেটব্যথা হলে মেডিল্যাব ক্লিনিকে নিয়ে গেলে ডা. জাহাঙ্গীর জানান, তার অ্যাপেন্ডিসাইটিক পেইন। তাই ইমার্জেন্সি অপারেশন করতে হবে। পরে অপারেশন না করে শিশুটিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গেলে শিশু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. নুরুজ্জামান জানান, অপারেশনের কোনো প্রয়োজন নেই। পেটে গ্যাসের কারণে এমনটি হয়েছে। অন্যদিকে সম্প্রতি কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুলাহপুর গ্রামের তানিয়া বেগমের পেটব্যথা হলে তাকে মেডিল্যাব ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়। পরে ডা. জাহাঙ্গীর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, তানিয়ার পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে এবং তার গর্ভে চার মাসের সন্তানও আছে। সে অনুযায়ী দু'দিন ক্লিনিকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করা হয় তানিয়াকে। পরে তাকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়। কিন্তু তানিয়ার ফের পেটব্যথা শুরু হলে মেডিল্যাবে নিয়ে এলে ডা. জাহাঙ্গীর এবার জানান, তার কিডনি ফুলে গেছে। এতে তানিয়ার অভিভাবকদের সন্দেহ হলে তাকে দ্রুত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, তানিয়ার পিত্তথলিতে কোনো পাথর নেই। এমনকি তার কিডনিও ফুলে যায়নি। আসলে তানিয়ার অ্যাপেন্ডিসাইট ফেটে গেছে, আর সেখানে ভুল চিকিৎসার কারণে তার গর্ভের সন্তানটি নষ্ট হয়ে গেছে। অবশেষে তানিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, একের পর এক ভুল চিকিৎসার কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রামের সহজ-সরল মানুষ। ফলে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন তারা।

সম্প্রতি এসব বিষয় জানতে সাংবাদিকরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে তাকে না পেয়ে তার মালিকানায় গড়া প্রাইভেট ক্লিনিক মেডিল্যাবে গেলে ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর বলেন, 'কাজ করলে ভুল হতেই পারে। ওটিতে নেওয়ার পর নাজমাকে অপারেশন করার মতো অবস্থা ছিল না। তারপরও আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করেছি। পরে গরিব মানুষ হিসেবে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে।'

অভিযোগ প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, 'তানিয়ার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'