হাবিপ্রবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে অনিয়ম

আপত্তি করেছেন কমিটিরই সদস্য

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর

দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) প্রভাষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিয়োগ কমিটিরই এক সদস্য। উপাচার্যের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তিনি চিঠিও দিয়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে, রিজেন্ট বোর্ড নিয়োগ দেওয়ার আগেই কয়েকজন প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সুপারিশের ভিত্তিতে। অথচ বঞ্চিত করা হচ্ছে লিখিত, মৌখিক ও প্রদর্শনী ক্লাস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া প্রার্থীকে। উপাচার্য এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তার পছন্দের শিক্ষকদের দিয়ে।

এদিকে ২২ কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিজ্ঞপ্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। অন্যদিকে ১৬ কর্মকর্তা নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও ২২ জনকে চাকরি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

২০১৮ সালের ১ মার্চ হাবিপ্রবিতে ২৯ প্রভাষক, ১৬ কর্মকর্তা ও ২২ কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। ৩১ মার্চ ছিল আবেদনপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ; কিন্তু অনিবার্য কারণ দেখিয়ে প্রভাষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের পরীক্ষার তারিখ কয়েকবার পেছানো হয়। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের মার্চে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা হয়।

এদিকে প্রভাষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের পরীক্ষা নোটিশ দিয়ে এবং তারিখ ঘোষণা করে নেওয়া হলেও কর্মচারীদের

মৌখিক পরীক্ষা অনেকটা গোপনেই হয়েছে। এ পরীক্ষার তারিখ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার কথা থাকলেও করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল কর্মচারী পরিষদের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ২২টি কর্মচারী পদের মধ্যে ১৮ টিতেই ভিসিপন্থিদের নিয়োগ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। এতে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হবেন।

প্রগতিশীল কর্মকর্তা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম স্বেচ্ছাচারিতা করা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে নিয়োগ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে।

এদিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ১৬ কর্মকর্তা নিয়োগের কথা বলা হলেও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ২২ জনকে। আগামী ৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের সভায় আলোচ্যসূচি হিসেবে এ বিষয়টিকে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মমিনুল ইসলাম বলেন, ২২ জনকে নিয়োগ দেওয়ার এ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক। এতে যোগ্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে, প্রশাসনের নিজস্ব লোকজনকে নিয়োগ দেওয়ার পাঁয়তারা করা হচ্ছে।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুনুর রশিদ বলেন, শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট বিভাগ থেকে নাম প্রস্তাব করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা অনুমোদন করে। তবে এবার নিয়োগ বোর্ডে রাখা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নিজস্ব কিংবা বিশেষ এলাকার পরিচিতদের। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়ার উপযোগী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন তিনি। ছাত্রশিবির কিংবা ছাত্রদলের সদস্যদের নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি করার জন্য লিখিত আবেদনের পরও তা করা হয়নি।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আব্দুর রশিদ বলেন, 'যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক। '

ডেইরি অ্যান্ড পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কৃষিবিদ শাহীন আলম বলেন, উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করে যাচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি অ্যান্ড পোলট্রি সায়েন্স বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগের আবেদন করেন বগুড়ার টলু মিয়ার ছেলে শাকিল ইসলাম। গত ২৮ মার্চ লিখিত, মৌখিক ও প্রদর্শনী ক্লাস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পান তিনি। কিন্তু তাকে নিয়োগের সুপারিশ না করে কম নম্বরপ্রাপ্ত এক প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় গত ১৩ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর আইনজীবীর মাধ্যমে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন তিনি। কিন্তু এরপরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সব পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া শাকিল ইসলাম। তার মতে, তিনি পরীক্ষায় ৭০ নম্বর পেয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানকারী পেয়েছেন ৫৬ নম্বর। অথচ তাকেই চাকরিতে নেওয়ার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে উকিল নোটিশ পাঠিয়েও কোনো কাজ হয়নি বলে জানান তিনি।

উদ্যানতত্ত্ব বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায়ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে ও প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্নিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান এবং প্রভাষক (উদ্যানতত্ত্ব) নিয়োগ কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. শরীফ মাহমুদ। গত ১০ মার্চ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর একটি চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি জানান। লিখিত চিঠিতে তিনি জানান, কমিটির ২ সদস্য লিখিত পরীক্ষার নম্বর দেখে মৌখিক পরীক্ষা ও শিক্ষাদান প্রদর্শনের সময় নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন। বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর মাস্টার ডিগ্রি অর্জনকারীদের প্রাপ্য ৩ নম্বর করে দেওয়া হয়নি। মৌখিক ও শিক্ষাদান প্রদর্শনের নম্বরও কম দেওয়া হয়েছে। ফলে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করলেও চূড়ান্ত ফলে তারা পিছিয়ে পড়েছে। নিয়োগ পরীক্ষায় অতিরিক্ত সনদপত্রের ক্ষেত্রে নম্বর বরাদ্দ থাকলেও প্রকাশনার বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। বিদেশে উচ্চ শিক্ষারত একজন প্রার্থীকে শুধু বিদেশ থেকে আসতে পারবে না, এমন অনুমানের ভিত্তিতে সম্মিলিতভাবে মৌখিক ও শিক্ষাদান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কম নম্বর দেওয়া হয়েছে। আপত্তি জানালেও বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি।

হাবিপ্রবির প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশীদ বলেন, নিয়মবহির্ভূতভাবে সিলেকশন কমিটি গঠন করায় যোগ্যরা সুযোগ পাচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রীর গোল্ড মেডেলপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরাও এখানে সুযোগ পাননি। এটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, জামায়াত-শিবিরের কেউ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুক্ত নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের সভাপতি প্রফেসর ড. বলরাম রায় বলেন, উপাচার্য আসার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়কে বিভক্ত করে অনিয়মের আখড়ায় পরিণত করেছেন। কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করায় প্রশাসনের সমালোচনা করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. ফজলুর রহমান বলেন, রিজেন্ট বোর্ড থেকে কম-বেশি লোকজন নিয়োগ দেওয়া সম্ভব। শিক্ষা কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন। নিয়োগের শতভাগই আইনগতভাবে করা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট বিভাগের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে নাম প্রস্তাবের বা সুপারিশের বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক নিয়ম আছে। প্রশাসক যদি মনে করেন তিনি এভাবে করবেন, তা হলে সেটাই যথেষ্ট। এর আগে কত ১৬, ২২ ও ৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তখন তো কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। এখন যেটা করা হচ্ছে, আইনকে মেনে সঠিক নিয়মেই করা হচ্ছে। পুলিশ ভেরিফিকেশনও রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করা হয়েছে।

এসব ব্যাপারে কথা বলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মু. আবুল কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার বাসভবনে যাওয়া হলেও ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মেলেনি।