চট্টগ্রামে অশ্রুভেজা কোরবানির চামড়া

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯      

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

নগরীর মোহরা এলাকার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ (৪৮)। এলাকা থেকে এবারের ঈদে দেড় শতাধিক চমড়া সংগ্রহ করেন এই মৌসুমি ব্যবসায়ী। কোরবানির দিন অর্থাৎ সোমবার চামড়া সংগ্রহের পর বিকেলের দিকে নগরীর বহদ্দারহাট মোড়ে নিয়ে আসেন। এখান থেকে অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী চামড়া সংগ্রহ করে নিয়ে যান। ফলে চামড়া নিয়ে পাইকারের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকেন নুর মোহাম্মদ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, আর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। রাত শেষে পরদিনে গড়ালেও কোনো পাইকারের দেখা নেই। দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে থাকা মুরাদপুর সংলগ্ন আতুরার ডিপোর চামড়ার আড়তগুলোতে খবর নিয়েও সুখবর পাওয়া গেল না। চামড়া নিয়ে আর কতক্ষণ বসে থাকা যায়! শেষ পর্যন্ত যেখানে চামড়া স্তূপ করে রেখেছিলেন, সেখানে ফেলে রেখেই খালি হাতে ফিরে যান। শুধু নুর মোহাম্মদই নন, চট্টগ্রামের বেশিরভাগ মৌসুমি ব্যবসায়ীকেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। অশ্রুভেজা চামড়াগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল রাস্তার ধারে। শুধু নগরীতে ফেলে যাওয়া এমন এক লাখেরও বেশি চামড়া পরিত্যক্ত অবস্থায় সংগ্রহ করে আবর্জনার ভাগাড়ে ফেলেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)! এমন ক্ষতিতে চোখের জলে ভাসছেন মাঠপর্যায়ের চামড়া ব্যবসায়ীরা।

চামড়া ফেলে যাওয়ার আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে বহদ্দারহাট মোড়ে কথা হয় নুর মোহাম্মদের সঙ্গে। কথা বলার সময় দু'চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকতে অশ্রু। তিনি বলেন, 'অনেক আশা নিয়ে ধারদেনা করে চামড়া সংগ্রহ করেছি। সেই চামড়া গাড়িতে করে নিয়ে আসতেও অনেক খরচ হয়েছে। সঙ্গে লোকজন রয়েছে। সব মিলিয়ে অনেক খরচ পড়েছে। কিন্তু চামড়া কেনার লোক নেই। অথচ প্রতিটি চামড়া কিনতে হয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। এই হিসাবে চামড়া কেনায় খরচ হওয়া ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকার পুরোটাই জলে গেছে।'

গত বছরও চামড়া বেচাকেনা নিয়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এ বছর যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এটা ভাবতেই পারেননি চামড়ার ক্রেতা-বিক্রেতারা। স্বাভাবিকের চেয়ে চামড়ার দাম অন্তত এক-তৃতীয়াংশ কম। আড়তদাররা কারসাজি করেই চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন বলে মনে করেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। আর চামড়ার বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দুষছেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা। মূলত এ দুটি পক্ষই মিলেমিশে চামড়ার দরপতন ঘটিয়েছে বলে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে। আড়তদাররা জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম ধরে রাখায় তারা সেই দামে চামড়া নিতে পারছেন না। আবার ঢাকার ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের আগের পাওনা টাকা না দেওয়ায় নির্ধারিত দামে চামড়া কিনতে পারছেন না। নগরীর চকবাজার এলাকায় একটি আড়তদারের পক্ষে চামড়া সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধি জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাজার পরিস্থিতি অনুমান করতে না পেরে বেশি দামে চামড়া সংগ্রহ করেছেন। সেই দামে আড়তদাররা সংগ্রহ করতে না পারায় তাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।

চট্টগ্রামে সাড়ে ৫ লাখ গরুর চামড়া ও ৮০ হাজার ছাগলের চামড়া সংগ্রহের টার্গেট নেওয়া হয়। এজন্য আড়তদারদের মতে, চট্টগ্রামে এই বছর ৪ লাখের কিছু বেশি গরু, ১ লাখ ২৫ হাজার ছাগল, ১৫ থেকে ১৬ হাজার মহিষ, ১৫ হাজারের মতো ভেড়া কোরবানি দেওয়া হয়েছে।

এবার বড় সাইজের প্রতিটি চামড়া গড়ে ৮০০ টাকা, মাঝারি সাইজের চামড়া গড়ে ৭২০ টাকা এবং ছোট সাইজের চামড়া ৬০০ টাকা করে পড়ার কথা ছিল। নগরীর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় খবর নিয়ে জানা গেছে, অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া বিক্রি করতে পারলেও তা করতে হয়েছে একেবারে পানির মূল্যে। কমবেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। অনেক এলাকায় কোরবানি দাতা লোকজন চামড়া বিক্রি করতে না পেরে বিভিন্ন মাদ্রাসায় দিয়ে আসেন। ফেলে দেন আশপাশের ডোবা-নালায়। বেশিরভাগ চামড়ার পথ ছিল নগরীর আতুরার ডিপোর কাঁচা চামড়া প্রধান আড়তগুলোতে। এখানে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অনেক মাদ্রাসা থেকেও চামড়া নিয়ে আসা হয়। ফলে এত চামড়া একসঙ্গে পড়ে থাকায় পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

কোরবানির দিন পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার ধারে কোরবানি পশুর চামড়া পড়ে থাকলেও সংগ্রহ করে চসিক। তবে পরদিনও চামড়াগুলো সরিয়ে না নেওয়ায় এগুলো থেকে পচা গন্ধ বের হতে থাকে। ফলে মঙ্গলবার থেকে চামড়াগুলো সরিয়ে নিতে থাকে। মঙ্গলবার দুপুর থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত ২০০ শ্রমিক ও ৮টি পেলোডারের সাহায্যে ৩২টি ট্রাকে ৯০ ট্রিপে এক লাখ পচা চামড়া অপসারণ করা হয়। বেশিরভাগ চামড়াই পড়েছিল নগরীর কাঁচা চামড়ার প্রধান বাজার হামজারবাগ, আতুরার ডিপোসহ বহদ্দারহাট ও আগ্রাবাদ এলাকায়।

চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নবিষয়ক কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, 'কোরবানির দিন থেকে বিভিন্ন এলাকায় চামড়া পড়েছিল। প্রথম দিকে আমরা তেমন কোনো গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু সময় গড়াতে থাকলেও চামড়াগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল না। অনেক জায়গা দেখা যায়, পরিত্যক্ত অবস্থায় চামড়া পড়ে রয়েছে। এগুলো থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। পরে এসব চামড়া সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। চামড়াগুলো সংগ্রহ করে চসিকে হালিশহরের আনন্দ বাজার ও আরেফিন নগরে আবর্জনার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়।'