নদী-বিলের পানিতে ভাসছে কোরবানির পশুর চামড়া

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯      

সমকাল ডেস্ক

নদী-খালবিলের পানিতে ভাসছে কোরবানির পশুর চামড়া। কোথাও মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। কেউ-বা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন। অনেক স্থানে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে শত শত চামড়া। এমন দৃশ্য সারাদেশে। কোরবানির চামড়ার দাম না পেয়ে ক্ষোভ-দুঃখ আর হতাশায় বিক্রি না করে চামড়া নষ্ট করে ফেলছেন খুচরা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কেউ আবার বিপুল লোকসানে নামেমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ট্যানারি মালিকরা কারসাজি করে চামড়ার দরে ধস নামিয়েছেন এমন অভিযোগ তুলে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ। সমকালের ব্যুরো, প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

খুলনা :নগরীর শেখপাড়া চামড়াপট্টি ঘুরে দেখা গেছে, সেখানকার ছয় থেকে আটজন ব্যবসায়ী এবার চামড়ার ব্যবসা করছেন। ক্ষুদ্র বিক্রেতা, মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষকরা তাদের কাছে চামড়া নিয়ে আসছেন। তারা চামড়াগুলো কিনে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করছেন। চামড়া ব্যবসায়ী মাত্র ছয়-আটজন হওয়ায় তারা যে দাম বলছেন, সেই দামেই চামড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন বিক্রেতারা। এতে বিপাকে পড়েছে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানা। মাদ্রাসা শিক্ষকরা জানান, কোরবানির সময় মানুষের দান করা চামড়া দিয়েই বছরের অর্ধেক ব্যয় নির্বাহ করেন তারা। কিন্তু এবারের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। সারাবছর এসব মাদ্রাসা ও এতিমখানা কীভাবে চলবে তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। খুলনার ফুলতলার সুপার ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কম। আর সরকার নির্ধারিত দামে অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। চামড়া ব্যবসায়ীরা ১২-১৫ টাকা ফুটে চামড়া কিনেছেন।

বরিশাল :নগরীর কাশীপুর বাজার মসজিদের সামনে কোরবানির দিন বিকেল থেকে একটি গরুর চামড়া পড়ে ছিল। কে বা কারা সেটি ফেলে রেখে যান। বরিশালের বিভিন্ন স্থানে এভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পশুর চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ক্রেতার অভাবে এভাবে চামড়া ফেলে রেখে যান অনেকে। বরিশালে চামড়া বিক্রির পাইকারি মোকাম নগরীর প্লবাতির ব্যবসায়ীরা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে আগ্রহী না থাকায় এমনটা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে চামড়ার ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে বেশিরভাগ পশুর চামড়া মাদ্রাসা-এতিমখানা ও মসজিদে দান করা হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানও দানের চামড়া নিয়ে পড়েছে বিপাকে।

বরিশালের ব্যবসায়ীরা স্বীকার করেছেন, দেশের চামড়া ব্যবসার প্রধান মোকাম ঢাকার ট্যানারি বাজারের ব্যবসায়ীরাই তাদের চামড়া কিনতে নিরুৎসাহিত করেছেন। এদিকে সারাদেশে সিন্ডিকেট করে পশুর চামড়ার বাজারে ধস নামানোর প্রতিবাদে গতকাল বরিশাল নগরীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাসদ।

বগুড়া :চামড়ার অস্বাভাবিক দরপতনে পশু কোরবানিদাতারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়ার মূল্য কমানো হয়েছে। এভাবে দাম কমিয়ে দেওয়ায় হতদরিদ্র লোকজন এবং মাদ্রাসার গরিব শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এদিকে কারসাজি করে চামড়ার দাম কমিয়ে দেওয়ায় মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়ায় বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে বাসদ। চামড়ার এই দরপতনকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, 'ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কোরবানির পশুর চামড়ার টাকা গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হয়। অর্থাৎ চামড়ার পয়সার ওপর তাদের অধিকার রয়েছে। কিন্তু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়ার দাম কমিয়ে অসচ্ছল এবং দুস্থ ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাহায্যনির্ভর আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর শত শত শিক্ষার্থীকে কষ্টের মুখে ঠেলে দেওয়া হলো।'

সুনামগঞ্জ :মঙ্গলবার জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর-শাহারপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর হোসাইনিয়া হাফিজিয়া আরাবিয়া দারুল হাদিস মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ৯০০ চামড়া পুঁতে রাখেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতি বছরের মতো এবারও মাদ্রাসার পক্ষ থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরবানি দাতাদের কাছ থেকে ৯০০ চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এসব চামড়া কিনতে আসেনি কেউ। বাধ্য হয়ে চামড়াগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। চামড়াগুলো সংগ্রহ এবং লবণ ব্যবহারে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। একইভাবে সুনামগঞ্জ শহরের হাছননগর মাদ্রাসায় একইভাবে ৩০০ কোরবানির পশুর চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। সুনামগঞ্জ শহরতলির হাছননগর আসাদিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ শামছুল ইসলাম বলেন, ৩০০ চামড়া সংগ্রহ করতে ৩০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। চামড়া সংগ্রহ করার পর বিক্রির জন্য ক্রেতা পাওয়া যায়নি। জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম মাসুম বলেন, জগন্নাথপুরে স্থানীয় কোনো চামড়া ব্যবসায়ী নেই। বাইরে থেকেও কেউ আসেনি। তবে চামড়া পুঁতে ফেলার ঘটনা খুবই দুঃখজনক।

ওসমানীনগর (সিলেট) :ওসমানীনগরে খালবিলে ভাসছে কোরবানির পশুর চামড়া। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সামান্য লাভের আশায় চামড়া কিনে আনলেও ক্রেতা না থাকায় চামড়াগুলো ফেলে দিতে বাধ্য হন। লাভের আশায় ঋণের টাকা বিনিয়োগ করে পুঁজি হারাতে হয়েছে তাদের। অন্যদিকে কম দরে চামড়া বিক্রির কারণে আর্থিক সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন গরিবরা। এ ছাড়া দানের চামড়া সংগ্রহ করে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এলাকার মাদ্রাসাগুলো।

ঈদের দিন রাতে উপজেলার ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র গোয়ালাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, স্তূপ করে চামড়া সাজিয়ে রেখে ক্রেতার অপেক্ষার প্রহর গুনছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কোনো ক্রেতা না থাকায় তাদের চোখেমুখে হতাশার চিহ্ন। ব্যবসায়ী ইদন মিয়া, সাহবে আলী ও সুজন মিয়া জানান, গড়ে ১০০ টাকা দরে চামড়া কিনেছিলেন। লাভ দূরের কথা, কোনো ক্রেতারই দেখা নেই। এখন চামড়াগুলো ফেলে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) : চামড়া বিক্রি করতে না পারায় অধিকাংশ পশু মালিককে চামড়া মাটিতে পুঁতে রাখতে দেখা গেছে। আবার বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কিছু চামড়া ক্রয় করলেও উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় তাও মাটিচাপা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, কক্সবাজারের উখিয়ায় বিক্রি করতে না পেরে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার খবর পাওয়া গেছে।