শোকাবহ ১৫ আগস্ট সেনা তৎপরতার মুখেও প্রতিবাদ

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯      

আবু সালেহ রনি

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদে দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেছিল হাজারও মানুষ। সারাদেশে কারফিউ ও সেনাবাহিনীর তৎপরতার মুখেও পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারী বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক এবং জিয়াউর রহমানের শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করে তারা। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের জুলাই পর্যন্ত তৎকালীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে চলা ওই যুদ্ধে অন্তত দেড়শ' জন শহীদ হন; আহত হন তিনশ'রও বেশি।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেইসব যোদ্ধার অনেকেই এখনও বেঁচে আছেন। অথচ প্রতিরোধ যুদ্ধ ও যোদ্ধাদের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি আজও। এমনকি যোদ্ধাদের দেওয়া হয়নি রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মাননাও।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্ম হয়। এরপর দেশ পুনর্গঠন করতে গিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের নানা চক্রান্তের সন্মুখীন হন জাতির পিতা। চক্রান্ত তখন এতটাই প্রকট হয়েছিল যে, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রকারীদের বুলেটে ঢাকার ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন তিনি।

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও চলে সেনাসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী

বাহিনীর বিশেষ অভিযান। তখনই একদল দামাল যোদ্ধা দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্ত্র হাতে 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' স্লোগানে স্বাধীনতাবিরোধীদের মসনদ কাঁপিয়ে তোলে, যাদের অনেকেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা সম্মিলিত প্রতিবাদ মিছিল করেছিল।

বিশ্নেষকদের মতে, পঁচাত্তর-পরবর্তী বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস সংগ্রহ করা না হলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভুল বার্তা পৌঁছাবে। অনেকেই বলে থাকেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশে তেমন কোনো প্রতিবাদ হয়নি। কোন পরিস্থিতিতে কেন এমন হয়েছিল তার তথ্যানুসন্ধান করতে হলে প্রতিরোধ যুদ্ধ ও যোদ্ধাদের তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। তাহলেই প্রকৃত সত্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পরিস্ম্ফুটিত হবে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনায় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের একজন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমরনায়ক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। তার নেতৃত্বে সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ১৭ হাজার মুজিবভক্ত। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরবর্তী প্রতিরোধ প্রসঙ্গে কাদের সিদ্দিকী সমকালকে বলেন, 'রেডিওতে (বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার) খবর শুনলাম, দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়েছে, শেখ মুজিবকে হত্যা করে সরকারকেও উৎখাত করা হয়েছে। এটা শোনার ১০ মিনিট পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। তখনই প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলাম- কামাল, জামাল ও রাসেলকে হত্যা করতে পারলেও আমি কাদের সিদ্দিকী তার (বঙ্গবন্ধু) চতুর্থ সন্তান, বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নেবই নেব।'

তিনি আরও বলেন, 'তখন আমার মনে হয়েছিল- যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারে, তারা আমাকে হত্যা না করলে আমি বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিবেদিত না। কারণ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে হত্যা। সে জন্যই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছিলাম, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম।'

কাদের সিদ্দিকী জানান, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রায় সতের হাজার মুজিবভক্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নেন। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ১০৪ জন মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে শতাধিক যোদ্ধাকে কারাগারে বন্দি থাকতে হয়।

প্রতিরোধ যোদ্ধাদের একজন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার তন্তর গ্রামের শফিকুল ইসলাম শফি। তিনি জানান, ১৯৭৬ সালে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আহত হয়ে তাদের হাতে ধরা পড়েন। তখন থানায় নিয়ে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। পরে তার ১০ বছরের সাজা হয়েছিল। তবে ১৯৮২ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। পরে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি ১৯৮৩ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হন।

প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে নলিতাপুর উপজেলার চকপাড়া গ্রামের ফজলুল হক সমকালকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা থেকে যুদ্ধ করেছিলাম। কোনো কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল না। তবে তাদের অনেকেই এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে অন্তত রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ যোদ্ধার স্বীকৃতি চান বলে জানান তিনি।

বিশিষ্টজনের কথা :প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ভূমিকা প্রসঙ্গে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সমকালকে বলেন, 'বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা সাহস করে প্রতিবাদ করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মতো আবারও অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন তাদের আন্তরিকতার জন্য সম্মান করি। আশা করি, এই উদাহরণ জাতি ভুলবে না।'

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, 'বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাদের সিদ্দিকীর ভূমিকা নিয়ে বহু সমালোচনা রয়েছে। তবে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি যেভাবে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, তা সত্যি সাহসিকতাপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেছিলেন। ইতিহাসে তার এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। একই ভাবে জাতীয় চার নেতাকেও যথাযোগ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী আওয়ামী লীগের ভূমিকার সমালোচনা করে শাহরিয়ার কবির বলেন, তখন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাক ক্ষমতায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন একটি ধারণা দিতে চেয়েছিল যে, আওয়ামী লীগই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণও ছিল বিভ্রান্ত। তারা বুঝতে পারছিল না যে, তাদের কি করণীয় রয়েছে। ঠিক সে সময় কাদের সিদ্দিকী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সংগঠিত করে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছিলেন। অবশ্য ভারত সরকার একপর্যায়ে কাদের সিদ্দিকী ও তার সঙ্গীদের আশ্রয় দিলেও সামরিক সহায়তা দেয়নি। যার ফলে তাদের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, 'বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক। তাই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং তাকে হত্যার পরবর্তী সময়ে কে কীভাবে ভূমিকা রেখেছিল সেটিও প্রকৃত ইতিহাস বিনির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় শুধু মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী যোদ্ধাদের বিষয়টি দলীয় (আওয়ামী লীগ) ফোরামের নজরে নেব। আশা করছি, দল একটি সিদ্ধান্ত দেবে।'