ওদের 'অন্যরকম ঈদ'

চট্টগ্রামে হাসপাতালেই ঈদ কেটেছে ডেঙ্গু আক্রান্ত চার শতাধিক রোগী ও তাদের স্বজনের

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

বেসরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মো. শাহীন। ফেনীর সোনাগাজীতে গ্রামের বাড়ি হলেও এক ভাই ও মাকে নিয়ে থাকেন চট্টগ্রাম নগরের খুলশী আমবাগান এলাকায়। অতীতের সবক'টি ঈদের কয়েকদিন আগে মাকে নিয়ে বাড়িতে যেতেন তিনি। কিন্তু জীবনে প্রথমবারের মতো এবার ঈদের পুরো সময়টুকু কাটাতে হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। ডেঙ্গু এবার ঈদ আনন্দ কেড়ে নিয়েছে তার। নিজে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় ঈদে বাড়ি যেতে পারেননি তার মা ও ভাই। তার মতো হাসপাতালে ঈদ কেটেছে তাদেরও। তবে এমন অবস্থা কেবল শাহীন কিংবা তার মা ও ভাইয়ের নয়, আরও অনেকেরই এবার জীবনের প্রথম 'অন্যরকম' ঈদ কেটেছে হাসপাতালে। ঈদের সময় সবাই যখন হই-হুল্লোড়, আনন্দে-আড্ডায় সময় পার করছে; ঠিক ওই সময়ে নানা আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তা নিয়ে সময় পার করতে হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনকে। তাদের মতে, আমাদের মতো এমন ঈদ যেন আর কারও জীবনে কখনও না আসে। ঈদের পুরো সময় হতাশা ও কষ্টে কেটেছে বলে জানিয়েছেন তারা। চমেক হাসপাতালসহ চট্টগ্রাম নগরের বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন চার শতাধিক রোগী।

শাহীন বলেন, 'পড়াশোনার কারণে বাড়িতে তেমন যেতে পারি না। ঈদই বাড়িতে যাওয়ার অন্যতম উপলক্ষ। প্রতিবারের মতো এবারও ঈদে বাড়ি যাওয়ার অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় সব স্বপ্ন ভেস্তে গেছে। আমার মতো মা ও ভাইয়েরও যাওয়া হয়নি বাড়িতে। এবারই জীবনে প্রথম হাসপাতালের বেডে শুয়ে কেটেছে ঈদ। আমি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় পরিবারেও ছিল না ঈদের আনন্দ।' ডেঙ্গু আক্রান্ত আরেকজন হলেন রুবিনা আক্তার। গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়ায় হলেও চাকরির সুবাদে থাকেন নগরের পতেঙ্গা এলাকায়। তিনি বলেন, 'প্রতি বছর ঈদের কয়েকদিন আগেই দুই সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। কিন্তু এবার আগে তো দূরে থাক, ঈদের দিনটিতেও মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারিনি। আমি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় আমার মতো ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত দুই সন্তানও। এবারের অন্যরকম ঈদ স্মরণীয় হয়ে থাকবে অনেক দিন।' ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে থাকা এক রোগীর মা বলেন, 'কখনও ভাবিনি ঈদের এই সময়ে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে সময় পার

করতে হবে। ছেলে অসুস্থ হওয়ায় খুব মন খারাপ পরিবারের সবার। ছেলেকে নিয়ে আমি হাসপাতালে থাকলেও বাড়িতেও এবার ছিল না ঈদের আনন্দ।' হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু আক্রান্ত মহসিনের বাবা মো. ইমাম হোসেন বলেন, 'সন্তান অসুস্থ হলে কি আর ঈদ পালন করা যায়? ছেলের এমন অসুস্থতার কারণে পরিবারের কারও কপালে ঈদ আনন্দ স্পর্শ করতে পারেনি।' এদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনের মতো কর্মব্যস্ততায় এবারের ঈদ কেটেছে চিকিৎসকদেরও। এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, 'ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মতো এবার ঈদ আসেনি চিকিৎসক-নার্সদেরও। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া কিংবা ভোগবিলাসের ঊর্ধ্বে উঠে মানবসেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। তবে এমন ঈদ কারও জীবনে কাম্য নয়।' তিনি জানান, ঈদের সময় চিকিৎসক ও নার্স মিলে দায়িত্ব পালন করেছেন ৩ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় তিন হাজার চিকিৎসক-নার্স দায়িত্ব পালন করেছেন। চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম জানান, এ পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৪২৫ জন ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে চিকিৎসাধীন আছেন ১০৭ জন। বুধবার এক দিনে নতুন আরও ২৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, 'ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও স্বজনদের মতো কয়েক হাজার চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তার এবারের ঈদ কেটেছে হাসপাতালে। এবারের ঈদ তাই অনেকের জীবনে অন্যরকম ঈদ।'