দুই ভাইয়ের বিরোধে ঝরে গেল তিন প্রাণ

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯      

ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

গ্রামের ঘরগুলো ঈদের আনন্দে উদ্বেলিত। স্বজনরা একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছে। সবার বাড়িতেই কোরবানির মাংসের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ। এরই মাঝে দুই ভাইয়ের পরিবারের পূর্ববিরোধ নিষ্পত্তির আনন্দের দিনে বাবা-ছেলেসহ নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। গতকাল বুধবার সকালে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে।

উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের কাঁঠালডাংড়ি গ্রামের নওয়াব আলী সরকারের ৫ ছেলের দু'জন আবদুর রাশিদ ও হাসিম উদ্দিন। কয়েক মাস আগে বড় ভাই আবদুর রাশিদের ছেলে হাবিবুর রহমানের ছোট্ট ছেলে মিজানকে চর-থাপ্পড় দেয় হাসিম উদ্দিন। বাড়ির পাশের একটি মাদ্রাসায় দুষ্টুমি করায় ওই শাসন করেন তিনি। এতে ক্ষুব্ধ হন আবদুর রাশিদ ও তার ছেলেরা। ওই সময় দুই পরিবারের মধ্যে সংঘর্ষ হলে উভয় পক্ষ থেকে দুটি মামলা হয় থানায়। বেশ কিছুদিন ধরে চলা বিরোধের জেরে গত ২৬ জুন ফের ঝগড়া হয় দুই পরিবারের মধ্যে। এ নিয়ে হাসিম উদ্দিনের ছেলে মাজহারুল ইসলাম বাদী হয়ে থানায় একটি অভিযোগও দেন। বিরোধ চলার সময় রাশিদের বাড়ির পাশে হাসিম নিজের জমিতে একটি পোলট্রি ফার্ম করেন। বাড়ি লাগোয়া পোলট্রি ফার্মের তীব্র গন্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে রাশিদের পরিবারের মধ্যে।

এদিকে দুই চাচার মধ্যে চলা বিরোধ নিষ্পত্তি করতে উদ্যোগ নেন সম্প্রতি প্রবাস থেকে আসা হারুন মিয়া। তিনি হাসিমের ভাই হায়দার মাস্টারের ছেলে। হারুনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে মীমাংসায় রাজি হন হাসিম। কিন্তু আবদুর রাশিদের ছেলেরা রাজি হচ্ছিল না তাতে। গতকাল বুধবার সকালে উভয় পক্ষের লোকজন আলোচনায় বসে বিরোধ মিটমাট করার কথা ছিল। কিন্তু রাশিদের পরিবার রাজি না হওয়ায় উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

বুধবার সকালে সাড়ে ৮টার দিকে হাসিমের ছেলে জহিরুল ইসলাম (২৫) চাচা আবদুর রাশিদের বাড়ির কাছে নিজেদের বৈদ্যুতিক পাম্প চালু করতে যান। ওই সময় ক্ষুব্ধ আবদুর রাশিদের ছেলেরা হামলা করে জহিরুলের ওপর। দেশীয় অস্ত্র দিয়ে জহিরুলকে কোপাতে থাকায় পোলট্রি

ফার্মে থাকা ছোট বোন রুনা আক্তার চিৎকার শুরু করেন। ছেলেকে কোপাচ্ছে শুনে দৌড়ে যান বাবা হাসিম উদ্দিন (৫৫)। তাকেও কোপাতে ধাওয়া দিলে দৌড়ে নিজ বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। ঘরের সামনে ফেলে হাসিম উদ্দিনকেও কুপিয়ে জখম করে তারা। ওই সময় আবদুর রাশিদের ছেলে আজিবুর রহমানও (৩০) জখম হন। গুরুতর জখম হন হাসিম উদ্দিনের ছেলে মাজহারুল ইসলাম ও খাইরুল ইসলাম। দ্রুত তাদের উদ্ধার করে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে জহিরুল ইসলামকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে নেওয়া হলে হাসিম উদ্দিন ও আজিবুর রহমানকেও মৃত ঘোষণা করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে পাঠানো হয়েছে হাসিম উদ্দিনের দুই ছেলে মাজহারুল ও খাইরুলকে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লেপ্টে আছে চারদিকে। বৃষ্টিতে কাদাজলে একাকার হয়ে আছে রক্ত। সেখানে দাঁড়িয়ে হত্যাযজ্ঞের নির্মমতার বর্ণনা শুনছিলেন ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গৌরীপুর সার্কেল) সাখের হোসেন সিদ্দিকী। বর্ণনা দিচ্ছিলেন হাসিম উদ্দিনের দুই মেয়ে রুনা ও রুবিনা। পাশেই ঘরে হাসিম উদ্দিনের স্ত্রী মমতাজ বেগমের আহাজারি থামানোর চেষ্টা করছিলেন স্বজনরা। স্বামী-সন্তান হারানো মমতাজ বেগম বলেন, 'আমার সব শেষ হয়ে গেল!' হাসিম উদ্দিনের মেয়ে রুনা আক্তার জানান, তার বাবা কিছু দিন আগে তার চাচাতো ভাইয়ের ছেলেকে শাসন করেছিলেন। এ নিয়ে তার বাবাকে মারধর করতে গেলে তার মায়ের মাথায় কোপ দেয়। বিষয়টি নিয়ে মামলা চলছিল। এটি নিষ্পত্তির কথা ছিল আজ (বুধবার)। কিন্তু তার চাচা আবদুর রাশিদ ও তার ছেলেরা লোকজন ভাড়া করে এনে তাদের ওপর হামলা করেছে। পরে নিজেরা বাঁচতে আজিবুরকে কুপিয়েছে নিজেরাই।

আবদুর রাশিদের বাড়িতে কাউকে পাওয়া যায়নি। আবদুর রাশিদ ও তার ছেলেদের ঘরে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করেছে। হত্যাকাণ্ডের স্থান থেকে রক্তমাখা রামদা, বল্লমসহ বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবুরি নামিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা করে পুলিশ।

নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি, পুলিশ সুপার শাহ্‌ আবিদ হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) এসএ নেওয়াজী, অতিক্তি পুলিশ সুপার (গৌরীপুর সার্কেল) সাখের হোসেন সিদ্দিকী প্রমুখ। এ ছাড়া গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাবের কয়েকটি টিম ঘটনাস্থলে যায়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাখের হোসেন সিদ্দিকী বলেন, 'হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবদুর রাশিদের জামাই রুহুল আমিনকে আটক করা হয়েছে। অন্য আসামি ধরতেও পুলিশের অভিযান চলছে।'

ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার শাহ্‌ আবিদ হোসেন বলেন, 'মাদ্রাসায় ছোট বাচ্চাকে মৃদু শাসন করাকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। তারপর বাড়ির পাশে মুরগির খামার স্থাপনসহ বিভিন্ন ইস্যু সৃষ্টি হয়। খুবই সাধারণ একটি ঘটনা থেকে দুই ভাইয়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটেছে। এক কথায় বলা যায়, এটি বর্বরোচিত। ঘটনার পর পুলিশের প্রথাগত কাজগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে। দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি মনে হচ্ছে পরিকল্পিত। সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়েই অস্ত্রগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল।'

ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি সাধারণ মানুষকে উদ্দেশ করে বলেন, নৃশংস-জঘন্য ঘটনা ঘটেছে। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচারে পুলিশকে সহায়তা করার আহ্বান জানান তিনি।