অপরাধী হয়ে প্রবেশ মানবিক হয়ে মুক্ত

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

পাল্টে গেছে নতুন চালু হওয়া কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের সার্বিক দৃশ্যপট। কয়েদি ও বন্দিদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ ও সুনাগরিকের দায়িত্ববোধ সৃষ্টির এক অভিনব প্রক্রিয়া চলছে এই কারাগারে। ফলে সব শ্রেণির কয়েদি ও বন্দির মধ্যেই শৃঙ্খলা-পারস্পরিক প্রীতির মেলবন্ধ তৈরি হয়েছে। দুই হাজার ৫০০ বন্দির ধারণক্ষমতাসংবলিত এই কারাগারে বর্তমানে বন্দি রয়েছে এক হাজার ২৯২ জন। কয়েদি ও বন্দিদের সমন্বয়ে প্রতিদিন সকালে কারা অভ্যন্তরে সাংস্কৃতিক আড্ডাসহ সৃজনশীল বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সাংস্কৃতিক আড্ডায় বন্দিরা বিভিন্ন যন্ত্র বাজিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। কেউ কেউ পরিবেশন করেন মজার কৌতুক। নাটকের অভিনয়েও তারা অংশ নেন। দেশাত্মবোধক, লালনগীতি ও উদ্দীপনামূলক গান ছাড়াও সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী বিভিন্ন গান এই আড্ডায়  পরিবেশিত হয়।

জেল সুপার বজলুর রশীদ নিজে একজন সংস্কৃতিবান মানুষ। তিনি গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী। তার লেখা ও সুর করা অনেক গান বন্দিরা নিয়মিত গেয়ে থাকেন। বিশেষ করে 'আমরা বীর বাঙালি জাতি, বিশ্বের বড় সম্মান নিয়ে আছি, তা হলে আমরা আর না দেরি করি, আমরা মাদকমুক্ত বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ গড়ি' এবং 'আমি যদি যেতে পারতাম স্বাধীনতার যুদ্ধে, আমি যদি হতে পারতাম বীর মুক্তিযোদ্ধা, আমি যদি শহীদ হতাম একাত্তরের যুদ্ধে, জন্ম আমার সফল হতো রে'- এ দুটো গান সব বন্দিকে দারুণভাবে উদ্দীপ্ত ও  প্রাণিত করেছে।

ফলে জেলা কারাগারটি সংস্কৃতি চর্চার একটি বিশেষ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। কারাগার থেকে বের হয়ে ওই বন্দিদের অনেকেই বাড়ি গিয়ে অপরাধমুক্ত শুদ্ধ জীবন নির্বাহের চেষ্টা করছেন।

জেল সুপারের উদ্যোগে কারা অভ্যন্তরে বন্দিদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে 'কারা পরিবারকল্যাণ সুরতরঙ্গ একাডেমি'। সুকণ্ঠের অধিকারী কারাবন্দিরা প্রতিদিন এই একাডেমির তত্ত্বাবধানে সঙ্গীতবিষয়ক প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন কারা তত্ত্বাবধায়ক বজলুর রশীদ। তাকে সার্বিক সহযোগিতা দেন কারাধ্যক্ষ বাহারুল ইসলাম। এ ছাড়া বন্দিদের মধ্যে কটিয়াদী উপজেলার বিল্লাল হোসেন এবং সিলেট জাফলংয়ের জোসেফ নতুন শিল্পীদের প্রাথমিক রেওয়াজের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। এরই মধ্যে কারাগারে মাত্র ছয় মাসে অন্তত ৫০ জন ভালোমানের কণ্ঠশিল্পী তৈরি হয়েছেন। তারা বিভিন্ন দিবস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিনে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

কারাগারে আটক শাহজামাল, রবিউল, হাসান মিয়াসহ অনেক বন্দি বলেছেন, কারাগারের ভেতর এ ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড চালু হওয়ায় তারা যে কারাগারে রয়েছে, সেটিই তাদের মনে থাকে না। আর অপরাধের জন্যও অনুশোচনায় ভুগি। মুক্তি পেলে সব অপরাধের ঊর্ধ্বে উঠে জীবনকে নতুন করে সাজানোর স্বপ্ন দেখছি।

কারাধ্যক্ষ বাহারুল ইসলাম জানান, বন্দি শিল্পীদের মধ্যে বিল্লাল হোসেন, জোসেফ, আনোয়ার, রুবেল, আবদুর রহিম, আবদুল আলী, মোমতাজ মিয়া, রুহুল আমিন বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পীদের সমকক্ষ। তাদের নিজস্ব কিছু গান শুনলে মন উতলা হয়ে ওঠে।

জেলা প্রশাসক সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী জানান, চাকরিজীবনে অনেকবার অনেক কারাগার পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছে। কিন্তু কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে যে অসাধারণ পরিবেশ, সংস্কৃতিপ্রেমী কারাবন্দি দেখেছি, তা আর

কখনও পাইনি।