রোহিঙ্গাদের তীব্র আপত্তির কারণে মিয়ানমারে তাদের প্রত্যাবাসন শুরু করার আরেকটি প্রয়াস কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এখনও হাল ছাড়ছেন না এবং আশা করছেন, রোহিঙ্গাদের রাজি করানো সম্ভব হবে।

এই আশাবাদের কারণ, বাংলাদেশের কূটনৈতিক দেনদরবারের কারণে প্রথমবারের মতো চীন এবার এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছে। কিন্তু চীনকে সম্পৃক্ত করেও তেমন কোনো সাফল্যের লক্ষণ এখনও নেই।

রোহিঙ্গাদের মনে নিরাপত্তার ভরসা তৈরি করতে মিয়ানমার যে উল্লেখযোগ্য কিছু করছে, তার কোনো ইঙ্গিত দেখা যায়নি। তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের ওপর এতটা ভরসা করা কতটা সঙ্গত হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য?

এ ব্যাপারে কুয়ালালামপুরে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব চায়নার অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের বাইরে তৃতীয় দেশ হিসেবে শুধু চীন রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে পারে। তবে অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত নিরাপত্তাসহ আরও নানা ইস্যুতে মিয়ানমার ও চীন একে অপরের ওপর অনেক নির্ভরশীল। তাদের মধ্যে সম্পর্কও বেশ ঘনিষ্ঠ। চীনের সমর্থন ছাড়া মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মদদ পাওয়া বেশ কঠিন। কাজেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল করতে বাংলাদেশের সহায়তায় চীন কতটা এগোবে, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায় বলে মনে করেন তিনি।

চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পেছনে দুটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন মাহমুদ আলী। প্রথমত, মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় চীনের স্বার্থ। এবং দ্বিতীয়ত, চীনের গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের সম্পৃক্ততা। চীন এমন কয়েকটি ক্ষেত্রে মিয়ানমারের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর চীন বড় কোনো চাপ প্রয়োগ করবে বলে তিনি মনে করেন না।

মাহমুদ আলী জানান, মিয়ানমারের ভেতরে চীনের বহু দশকের বিনিয়োগ রয়েছে। বিশেষ করে ষাটের দশক থেকে মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসন এবং অতি সম্প্রতি যে দলীয় রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের সঙ্গেও চীনের সম্পর্ক ক্রমে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এর কারণ, মিয়ানমারের স্বার্থ নয়। এর কারণ, চীনের একটা বিশাল অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক স্বার্থ রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরের মালাক্কা প্রণালি দিয়ে চীনের ৮৫ শতাংশ তেল ও জ্বালানি গ্যাস সরবরাহ হয়। সেই প্রণালিতে শত্রুভাবাপন্ন দেশের নিয়ন্ত্রণ থাকায় চীনকে নানা রকম সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। চীনের বড় আশঙ্কা হলো, এই প্রণালিকে তারা যদি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে না নিতে পারে, তাহলে যে কোনো সময় তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সে জন্য তারা মিয়ানমার, পাকিস্তান এবং অন্যান্য দেশের মাধ্যমে তাদের জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প একটি ব্যবস্থা করে রেখেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উপকূলে চাউথিউ নামে একটি বন্দরে চীন সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে।

চীন মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও জ্বালানি গ্যাস আমদানি করে, যা এ বন্দরে নামানো হয়।

এই তেল ও জ্বালানি গ্যাস সরবরাহের জন্য চীনারা কয়েক বছর ধরে কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে ওই বন্দর দিয়ে দুটি পাইপলাইন বসিয়েছে এবং এ জন্য মিয়ানমারকে তাদের অনেক অর্থ দিতে হয়েছে।

ওই পাইপলাইন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও জ্বালানি গ্যাস চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ে পাঠানো হয়। পাইপলাইনের যেন কোনো ক্ষতি না হয় এবং জ্বালানি তেল/গ্যাসের সরবরাহ যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকতে পারে, সে জন্য চীন কিছুটা মিয়ানমার সরকারের কাছে দায়বদ্ধ বলে মনে করেন মাহমুদ আলী।

কাজেই এ পাইপলাইন যেহেতু রাখাইন অঞ্চলের ভেতর দিয়ে যায়, তাই রাখাইন রাজ্য যেন মিয়ানমার সরকারের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেটা চীনের স্বার্থের মধ্যেও পড়ে।

তিনি বলেন, যখন মিয়ানমার সরকার দাবি করছে, আরাকানি বিদ্রোহীরা মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী, অর্থাৎ পুলিশ, আধাসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীও ওই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে, তখন চীন এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারছে না।

রোহিঙ্গা সংকট সামাল দিতে বাংলাদেশকে আরও বাস্তবসম্মত নীতিমালা গ্রহণ করার পাশাপাশি স্বনির্ভর হয়ে ওঠা প্রয়োজন বলে মনে করেন মাহমুদ আলী। তিনি বলেন, অন্য দেশের ওপর অতি নির্ভরশীলতা কমাতে বাংলাদেশের উচিত হবে অর্থনৈতিক নীতিমালা শক্তিশালী করা, দেশের অভ্যন্তরে সমর্থনের যে ঘাঁটি রয়েছে, সেটা গড়ে তোলা। যেন বাংলাদেশ নিজের দেখাশোনা নিজেই করতে পারে।

মন্তব্য করুন