প্রায় শতবছর আগে রবীন্দ্রনাথ তার 'প্রশ্ন' কবিতায় লিখেছিলেন 'বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।' বিচারাঙ্গনে বহুল প্রচারিত বাণী হচ্ছে 'জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড' (বিচার বিলম্বিত হলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়)। ফেনীর আলোচিত চাঞ্চল্যকর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় বিচার বিলম্বিত ও নিভৃতে কাঁদার অপবাদ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ও বিচার-সংশ্নিষ্টদের একাগ্রতায় দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবীরা এ মামলার বিচার কার্যক্রমকে 'মাইলফলক' ও 'যুগান্তকারী' বলে মন্তব্য করেছেন।

ইতিমধ্যেই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। এরপর আসবে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের পালা। তারপরই রায়। সব মিলিয়ে এ মামলায় দ্রুততম সময়ে রায়ের নজির সৃষ্টি হতে পারে। ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে চলছে এ মামলার বিচার কাজ। এ ধরনের ট্রাইব্যুনালে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। তবে সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, মাত্র ৩৫ কার্যদিবসে নুসরাত হত্যা মামলার সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হচ্ছে।

গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাতকে যৌন নির্যাতন করে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। এ ব্যাপারে মামলা হলে পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে। পরে অধ্যক্ষ সমর্থকরা গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। এতে তার মৃত্যু হলে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার তদন্ত মাত্র ৩৩ কার্যদিবসে শেষ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে। এতে অধ্যক্ষ সিরাজসহ ১৬ জনকে আসামি এবং ৯২ জনকে সাক্ষী করা হয়। ফেনী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ ২০ জুন বিচার কাজ শুরু করেন। ২৭ জুন থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এরপর থেকে বিরতিহীনভাবে প্রতিটি কার্যদিবসে সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও বিভিন্ন আবেদনের নিষ্পত্তি করেন তিনি। মাত্র ৩৫ কার্যদিবসে মামলার ৮৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা হয়। এরপর শুরু হবে তদন্ত কর্মকর্তার জেরা। চলতি মাসের মধ্যে মামলা রায়ের জন্য প্রস্তুত হবে বলে আইনজীবীরা আশা করছেন।

মামলা শুরুর প্রথম দিকে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা জেরা ও সাক্ষ্যগ্রহণে প্রস্তুতির জন্য বিরতি দিয়ে মামলার তারিখ ধার্য করার আবেদন জানান। বিচারক আইনজীবীদের মামলার গুরুত্ব বুঝিয়ে প্রতি কার্য দিবসে অংশ নিতে সম্মত করান। বিচারক আসামিপক্ষের সব আবেদনে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দপ্তর থেকে মামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন রিপোর্ট, মোবাইল কললিস্ট, থানার রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করে মামলার নথিতে সংযুক্ত করেন। প্রত্যেক সাক্ষী কালক্ষেপণ না করে নির্ধারিত দিন আদালতে  সাক্ষ্য প্রদান করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলমের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা আগামী ২-৩ কার্যদিবসে শেষ হবে। এরপর যুক্তিতর্কে সর্বোচ্চ ৭-৮ কার্যদিবস লাগতে পারে। এটা শেষ হলেই রায় ঘোষণার সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে। তিনি আশা করেন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি রায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এ মামলার গতিকে তিনি 'যুগান্তকারী' বলে আখ্যায়িত করেছেন।

পিপি হাফেজ আহম্মদ জানান, বিচারকের দৃঢ়তা, বাদী ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সহযোগিতা ও সাক্ষীদের একাগ্রতায় মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। প্রতিটি কার্যদিবসে মামলার কার্যক্রম চালানো আদালত সংশ্নিষ্টদের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব ছিল না। নির্ধারিত সময়ের প্রায় অর্ধেক বাকি থাকতেই এ মামলার রায় দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করেন। তিনি নুসরাত হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রমকে 'মাইলফলক' বলে মন্তব্য করেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী কামরুল হাসানও মামলার গতিতে সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, মামলার কার্যক্রম দ্রুত হওয়ায় ন্যায় বিচারের ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে আইনজীবীসহ সংশ্নিষ্টদের পরিশ্রম করতে হয়েছে। প্রবীণ আইনজীবী আহসান কবির বেঙ্গল বলেন, পিবিআই তাড়াহুড়া করতে গিয়ে মনগড়া অভিযোগপত্র তৈরি করেছেন। তবে আদালতে শুনানি হয়েছে সঠিকভাবে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহফুজুল হক বলেন, পিবিআই হত্যার কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী উপস্থাপন করতে পারেনি। এটি পরীক্ষা কেন্দ্রের ঘটনা। পুলিশ ১৪৪ ধারা মতে পাহারা দিচ্ছিল। অথচ কেউ ঘটনা দেখেনি তা অবিশ্বাস্য। পিবিআই তাড়াহুড়া করতে গিয়ে শুধু ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে হত্যা প্রমাণের চেষ্টা করেছে। মামলার বাদী নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান মামলার কার্যক্রমে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

মন্তব্য করুন