পুলিশের ভুলে ১৭ বছরেও শুরু হয়নি বিচার

চট্টগ্রামের পাঁচ গুদামের সোয়া কোটি টাকার খাদ্য আত্মসাৎ

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯      

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে পাঁচটি খাদ্য গুদাম থেকে এক কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার টাকার চাল, গম ও ভোজ্যতেল আত্মসাতের ঘটনা ঘটে ২০০২ সালে। অথচ ২০১৯ সালে এসেও এই দুর্নীতি মামলার বিচার শুরু হয়নি। কারণ দুদক আইনের ধারায় দায়ের করা মামলা তদন্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছিল পুলিশ। পুলিশের এই এক ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে ১৭ বছর! আদালতের নির্দেশে পরে দুদক একই মামলা ফের তদন্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করলেও এর মধ্যে কেটে গেছে ১৭টি বছর। তাই এখনও বিচারের বাইরে রয়ে গেছেন সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা দুই খাদ্য কর্মকর্তা। একটি মামলা দুটি সংস্থা তদন্ত করলেও আত্মসাৎ ঘটনার মূল হোতা খাদ্য পরিদর্শক সাধন চন্দ্র মুহুরী ১৭ বছর ধরে রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ ও দুদক কেউ গ্রেফতার করতে পারেনি তাকে।

দুদক পিপি আব্দুল হান্নান সম্প্রতি বলেন, 'খাদ্য গুদামের দুর্নীতি মামলাটি পুলিশ তদন্ত করে চার্জশিট দেওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়েই এই দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। তাই মামলাটির এখনও বিচার শুরু হয়নি।'

দুদক আইনের ধারার মামলাটির তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা নগরীর ডবলমুরিং থানার তৎকালীন এস আই বিজন বড়ূয়া বলেন, 'বহু বছর আগের ঘটনা হওয়ায় এখন বিস্তারিত মনে নেই। দুদকের ধারার মামলা হয়তো তখন পুলিশও তদন্ত করতে পারত। তাই করেছি। ভুল হয়েছে কি-না বলতে পারব না।' এই পুলিশ কর্মকর্তা এখন চট্টগ্রাম  জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে ইন্সপেক্টর হিসেবে  কর্মরত রয়েছেন।

২০০৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নগরীর ডবলমুরিং থানায় দুর্নীতি দমন আইনের ৫(২) ধারাসহ দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় দুই খাদ্য কর্মকর্তাকে আসামি করে একটি দুর্নীতি মামলা দায়ের হয়। সেই মামলা তদন্ত শেষে ২০০৪ সালের ২০ জুন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে চার্জশিট  দাখিল করেন ডবলমুরিং থানার তৎকালীন এস আই পুলিশ কর্মকর্তা বিজন বড়ূয়া। এরপর দীর্ঘ এক যুগ পরে এসে ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ মীর রুহুল আমিনের আদালত পুলিশের তদন্ত করা দুর্নীতি মামলাটির চার্জশিট আমলে নিয়ে বিচার শুরু করা আইনসম্মত নয় মর্মে দুর্নীতি মামলাটি দুদকে পাঠানোর আদেশ দেন। এই আদেশে বিচারক উল্লেখ করেন, 'হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার আলোকে দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা ২০০৭-এর রুল ১৫-এর বিধি (৪) ও (৫) অনুসারে অত্র মামলাটি বিচারের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুমোদনের নিমিত্তে মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হোক। কমিশনের অনুমোদন ছাড়া মামলার বিচার আইনসম্মত হবে না।'

পরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মামলাটি দুদকের অনুমোদনের জন্য চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের মাধ্যমে স্থানীয় দুর্নীতি দমন অফিসে পাঠান। ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে মামলাটির বিচারের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন মামলাটি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে রয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর অবশেষে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শুরুর জন্য আদেশ দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. আকবর হোসেন মৃধার আদালত। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটির শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় খাদ্য মজুদের স্থান দেওয়ানহাট সিএসডির ৭, ৮, ৩২, ৩৩ ও ৪৫ নম্বর খাদ্য গুদাম থেকে তিন লাখ ৮৯ হাজার ৪৯৯ মেট্রিক টন চাল, ১৮ হাজার ৫২৯ মেট্রিক টন গম, ২৮৫ কেজি ভোজ্যতেল, চার হাজার ৮১টি খালি বস্তা গায়েব হয়ে যায়। খাদ্য বিভাগের হিসাব মতে এসব পণ্যের মূল্যে এক কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার ৪৮ টাকা করেন। এসব গুদামের ডেলিভারি অর্ডার শাখায় কর্মরত ছিলেন খাদ্য পরিদর্শক সাধন চন্দ্র মুহুরী। তার তত্ত্বাবধানে ছিল এসব পণ্যসামগ্রী। পরে খাদ্য অধিদপ্তরের নিজস্ব তদন্তে এসব পণ্য সাধন চন্দ্র মুহুরী আত্মসাৎ করেছেন মর্মে প্রতিবেদনে উঠে আসে। আর সাধন চন্দ্র বিপুল পরিমাণ সরকারি পণ্য আত্মসাৎ করলেও বিষয়টি অবগত হয়েও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া দেওয়ানহাট সিএসডির ব্যবস্থাপক গোলাম মাওলাকেও সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। ২০০৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নগরীর ডবলমুরিং থানায় এ দুই কর্মকর্তাকে আসামি করে দুর্নীতি মামলা হয়। পরে পুলিশ ও দুদকের তদন্তে তাদের অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। কিন্তু মামলা দায়েরের পর থেকে এখনও পলাতক মূল হোতা সাধন চন্দ্র মুহুরী।