তদন্ত হয়, আলোর মুখ দেখে না প্রতিবেদন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাপত্র জালিয়াতি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯      

জাবি সংবাদদাতা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) একের পর এক গবেষণাপত্র জালিয়াতির অভিযোগ উঠলেও নীরব ভূমিকায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কোনো প্রতিবেদন এখনও আলোর মুখ দেখেনি। আবার কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিশ্নেষকরা বলছেন, নিজেদের পদোন্নতির জন্য শিক্ষকরা গবেষণাপত্র জালিয়াতির মতো অনৈতিক কাজ করছেন। এ নিয়ে কোনো শাস্তির ইতিহাস না থাকায় এ ধরনের জালিয়াতি বারবার ঘটছে।

গত পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫টি গবেষণাপত্র জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২টির তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। অপর ৩টি জালিয়াতির ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সমকালের অনুসন্ধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগে গবেষণাপত্র জালিয়াতিতে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশে অনীহার বিষয়টি উঠেছে।

প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান এবং ফার্মাসি বিভাগ :ডায়রিয়া রোগ বিষয়ে 'সালমোনেলা' প্রজাতির ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষেধক তৈরির জন্য গবেষণা করেন প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আফরোজা পারভীন, সহকারী অধ্যাপক মো. মাহমুদুল হাসান ও ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাকিব হাসান। এ গবেষণাপত্রটি ২০১৫ সালে প্রবন্ধ আকারে 'ব্রিটিশ মাইক্রোবায়োলজি রিসার্চ জার্নাল'-এ প্রকাশ করা হয়। জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ এনে ওই শিক্ষকসহ তার দুই সহ-গবেষকের শাস্তি দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর'বি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. কায়সার আলী তালুকদার। তিনি বলেন, আইসিডিডিআর'বির আর্থিক সহায়তায় আমার তত্ত্বাবধানে এ গবেষণা প্রকল্পটি পরিচালিত হয়। প্রবন্ধ আকারে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটির পরিকল্পনাও করেছি আমি। কিন্তু গবেষণা প্রবন্ধটি আফরোজা পারভীন আমার অনুমতি ছাড়াই জার্নালে প্রকাশ করেছেন।

এ ঘটনায় জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বার হাওলাদারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিলেও গত চার বছরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা প্রকাশ করেনি।

আইআইটি বিভাগ :বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইআইটি) শিক্ষক শহিদুল ইসলামের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করার অভিযোগ ওঠে ইনস্টিটিউটের সহকর্মী অধ্যাপক ফজলুল করিম পাটোয়ারী ও ৩৯তম আবর্তনের ছাত্রী তানজিয়া এ্যানির বিরুদ্ধে। তারা শহিদুল ইসলামের প্রোগ্রাম কোডটি গবেষণা কাজে পরীক্ষার জন্য নেন। কোথাও ব্যবহার না করার শর্ত থাকা সত্ত্বেও সেটি তারা তাদের গবেষণাতে হুবহু ব্যবহার করেছেন। এ ঘটনায় পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ফরহাদ হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ বিষয়ে অধ্যাপক ফরহাদ জানান, চলতি বছরের মার্চ মাসে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়াও আইআইটির একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্তে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কেএম আককাছ আলী এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তা ভেস্তে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইংরেজি বিভাগ :ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সাবেরা সুলতানার বিরুদ্ধে দুটি গবেষণা প্রবন্ধে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেম্পার অধ্যাপক ক্যাথরিন ভ্যান স্প্যাংকেরেনের একটি বইয়ের সঙ্গে তার প্রবন্ধের বেশ কিছু অংশের হুবহু মিল রয়েছে, যা ব্যবহার করে পদোন্নতি পেয়েছেন সাবেরা। এ ছাড়া, ভারতীয় চারজন লেখকের লেখার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের জার্নালে প্রকাশিত সাবেরা সুলতানার আরেকটি গবেষণা প্রবন্ধের বিভিন্ন অংশের মিল পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। দর্শন বিভাগ সাবেরা সুলতানার জালিয়াতির বিষয় জানার পর ২০১৫ সালে একাডেমিক কমিটির সভায় অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা জানার পর এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ বিষয়ে অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনটি আমি অনেক আগেই জমা দিয়েছি বিভাগের তৎকালীন সভাপতির কাছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ কেন নেওয়া হয়নি, তা আমার জানা নেই।

পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ :'ভুল তথ্য' দিয়ে গবেষণাপত্র তৈরির অভিযোগ ওঠে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শারমিন আকতার শিমুর বিরুদ্ধে। ২০১৭ সালে জাপানের এক জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণাপত্রটি তৈরিতে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দীনসহ মোট নয়জন সহ-গবেষক ছিলেন। কিন্তু এতে যে প্রযুক্তি সহায়তা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে ওই প্রযুক্তি (ঋঅঅঝ- ঋষধসব ধঃড়সরপ ধনংড়ৎঢ়ঃরড়হ ংঢ়বপঃৎড়সবঃবৎ) নেই। এতে 'মিথ্যা তথ্য' দিয়ে ওই গবেষণাপত্রটি তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগেরই কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী। ওই প্রযুক্তি এখনও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ কিংবা ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে নেই বলে জানিয়েছেন পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. আমির হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, কেউ লিখিতভাবে অভিযোগ দেয়নি। তাই আমরা বিভাগ থেকে এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি। তবে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানলেও এখন পর্যন্ত কিছু করেনি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বলেন, যেসব শিক্ষক নিজেদের পদোন্নতির জন্য এ ধরনের অনৈতিক কাজ করছেন, তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এসব অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ফার্মাসি বিভাগ এবং আইআইটি বিভাগের প্রতিবেদন এসেছে। তা সিন্ডিকেটেও উঠেছে। আর তিনটির বিষয়ে জানি না।

এ ধরনের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য লজ্জাকর জানিয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, শিক্ষকদের গবেষণাপত্র জালিয়াতির জন্য বড় দুটি কারণ রয়েছে। একটি হচ্ছে যোগ্যতা না দেখে শিক্ষক নিয়োগ; দ্বিতীয়টি হচ্ছে শিক্ষকদের গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই। আর এসব বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় এ ঘটনা বাড়ছে।