যে কারণে বছরজুড়ে মশার বাড়বাড়ন্ত

নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সবকিছুতেই ঘাটতি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯      

অমিতোষ পাল

অপ্রতুল জনবল ও যন্ত্রপাতি দিয়ে চলছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রম। যেখানে প্রতি ওয়ার্ডে অন্তত ১৫টি করে ফগার মেশিন থাকা প্রয়োজন, সেখানে আছে এর এক-তৃতীয়াংশেরও কম। হস্তচালিত মেশিনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। পাশাপাশি যেখানে জনবল প্রয়োজন দুই হাজার, সেখানে আছে তার এক-তৃতীয়াংশ। আবার যে মেশিনগুলো আছে, সেগুলোও মাঝেমধ্যে ঠিকমতো কাজ করে না। মশক নিধনের দায়িত্ব পালনকারী কর্মীরাও কাজে ফাঁকি দেন। ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও ঠিকমতো তদারকি করেন না। এছাড়া অনেক সময় মশার ওষুধের সরবরাহেও ঘাটতি থাকে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে প্রায় বছরজুড়েই থাকে মশার বাড়বাড়ন্ত।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মশক নিধনে যে পরিমাণ যন্ত্রপাতি ও জনবলের প্রয়োজন, তার সবকিছুতেই ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে মূলত ঝড়-বৃষ্টি-শীতের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। তারা বলেন, বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আয়তন ১২৯ বর্গকিলোমিটার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আয়তন ২৭০ বর্গকিলোমিটার। পুরো এলাকায় মশকনিধন কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে সবকিছুতেই অভাব রয়েছে। চলতি মৌসুমে এডিস মশার ব্যাপক দৌরাত্ম্য শুরু হলে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। তাদের তেমন কোনো প্রশিক্ষণও নেই। ফলে ওই জনবল দিয়ে মশকনিধন কার্যক্রমে তেমন সফলতা আসছে না।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে ডিএনসিসিতে যুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডে মশকনিধন কার্যক্রম চালাতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১০ জন করে লোক নেওয়া হয়েছে। ২০০ ফগার মেশিন কেনা চূড়ান্ত হয়েছে। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। নতুন অর্গানোগ্রামে প্রয়োজনীয় জনবলের প্রস্তাব আছে। সেটা অনুমোদন হলে এসব পদে স্থায়ীভাবে জনবল নিয়োগ দেওয়া যাবে। তখন আর কোনো সমস্যা হবে না।

প্রায় একই কথা বলেছেন ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। তিনি বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন, তার এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে করপোরেশন চলছে। কেবল মশকনিধন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেই নয়, সব বিভাগেই এ রকম অবস্থা। তিনি বলেন, করপোরেশনেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। করপোরেশন চেষ্টা করছে, সীমিত জনবল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নগরবাসীর সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার।

জানা গেছে, বর্তমানে ডিএসসিসিতে ৭২টি ওয়ার্ড রয়েছে। এর বিপরীতে ফগার মেশিন আছে ২৮৯টি। হস্তচালিত মেশিন আছে ৩৭৭টি। জনবল ৪২৯। সংশ্নিষ্টরা জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত ১৫টি করে ফগার মেশিন ও ১৫টি করে হস্তচালিত মেশিন প্রয়োজন। এ হিসাবে এক হাজার ৮০টি ফগার মেশিন ও সমসংখ্যক হস্তচালিত মেশিন প্রয়োজন। জনবল প্রয়োজন এক হাজার ৮০।

অন্যদিকে ডিএনসিসিতে ফগার মেশিন আছে ৩২২টি ও হস্তচালিত মেশিন ৪১৪টি। বিপরীতে জনবল ২৮০। অথচ জনবল প্রয়োজন ৮৪০। ফগার মেশিন প্রয়োজন ৮৪০টি ও সমসংখ্যক হস্তচালিত মেশিনও দরকার। তবে এ ক্ষেত্রে ডিএনসিসির আয়তন ডিএসসিসির চেয়ে দ্বিগুণ হওয়ায় মেশিন ও জনবল আরও বেশি প্রয়োজন বলেও মনে করেন ডিএনসিসির কর্মকর্তারা। তারা বলেন, আয়তন একটি বড় বিষয়। কারণ আয়তন যত বেশি হবে মশাও তত বেশি হবে। জনবল ও যন্ত্রপাতিও ততটাই বেশি প্রয়োজন। এছাড়া ডিএনসিসি এলাকায় ডোবা-নালা-জলাশয়ের মতো ব্যাপক মাত্রায় মশার প্রজনন অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। কাজেই জনবল ও মেশিন আরও বেশি প্রয়োজন। কিন্তু তারা সেই ব্যবস্থা করতে পারছেন না। এডিস মশার দৌরাত্ম্য শুরু হওয়ার পর ২০০ ফগার মেশিন সংগ্রহের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অস্থায়ী  ভিত্তিতে কিছু লোক নিয়োগ দেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মশক নিধনের দায়িত্বে যে পরিমাণ জনবল রয়েছে, তাদের মনিটরিংয়ে ঘাটতি আছে। তারা কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য অল্প জায়গায় স্প্রে করেই ওষুধ শেষ করে ঘরে ফেরে। অনেকে মেশিনের সমস্যার দোহাই দিয়ে কাজে ফাঁকি দেয়। তারা ঠিকমতো কাজ করছে কি-না, সেটা দেখার দায়িত্ব স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের। তবে ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও এ ব্যাপারে তেমন গা করেন না।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জামাল মোস্তফা বলেন, তার ওয়ার্ডে দরকার ১৫টি ফগার মেশিন ও ১৫টি হস্তচালিত মেশিন। আছে মাত্র দুটি। সেই মেশিন দিয়ে তারাইবা কতটা কাজ করবে। ফগারম্যানদের চাপ দিয়ে তো লাভ নেই। এত বড় একটি ওয়ার্ডে তো দুই-চারজন ফগারম্যান দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তারপরও তিনি সবসময় তদারকি করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশক নিধনকর্মী আনোয়ার জানান, তারা চেষ্টা করেন সঠিকভাবে মশার ওষুধ দেওয়ার। কিন্তু কোনো এলাকায় ওষুধ দিতে গেলে লোকজন জোর করে তার বাড়িতে ধরে নিয়ে যায়। পুরো ওষুধ শেষ না করলে তাকে ছাড়ে না। অনেক সময় ছোট ছেলেপুলেরা ফগারম্যানদের পেছনে লাগে। নগরবাসীও তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলে। এ রকম নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে তাদের কাজ করতে হয়। এছাড়া মাঝেমধ্যে মেশিনও স্টার্ট নেয় না।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মী বলেন, মশার ওষুধের মান নিয়ে তো প্রশ্ন আছেই। তবে মশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল, মেশিন ও মশক নিধনকর্মীদের মনিটরিং। তবে মশক নিধনকর্মীদের মনিটরিংয়ে ব্যাপক ঘাটতি আছে। এভাবে সব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে কখনোই মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে না।