বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত হচ্ছে সাবমেরিন কেবল ব্যবসা

লাইসেন্স ফি তিন কোটি টাকা

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯      

রাশেদ মেহেদী

বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত হচ্ছে সাবমেরিন কেবল ব্যবসা। নীতিমালা তৈরির কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চলতি আগস্ট মাসেই এ নীতিমালা জারি করা হতে পারে। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে জানিয়েছেন, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে এখন ইউনিয়ন পর্যায়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। এর ফলে আগামীতে বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের চাহিদা বাড়বে। এ চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানিকে তৃতীয় সাবমেরিন কেবলে যুক্ত করার পদক্ষেপের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে সাবমেরিন কেবল ব্যবসা উন্মুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ লক্ষ্যেই একটি নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন নীতিমালার আলোকে লাইসেন্স ফির প্রস্তাব করা হয়েছে তিন কোটি টাকা। সেই সঙ্গে প্রতি বছরের নবায়ন ফি ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া কোম্পানিকে এক শতাংশ হারে রাজস্ব শেয়ার করতে হবে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে। আর সংশ্নিষ্ট কোম্পানির ব্যাংক জামানত হিসেবে থাকতে হবে দুই কোটি টাকা। লাইসেন্সের মেয়াদ হবে ১৫ বছর। বেসরকারি খাতে লাইসেন্স উন্মুক্ত থাকবে। কয়টি লাইসেন্স দেওয়া হবে, তা নীতিমলায় সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

সূত্র আরও জানায়, নীতিমালাটির খসড়া তৈরির পর তা বিটিআরসি থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়। পরে বিভাগ থেকে যাচাই-বাছাই এবং সুপারিশসহ পাঠানো হয় বিটিআরসিতে। এখন শেষ পর্যায়ের সংযোজন-বিয়োজনের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে আবারও ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য। বিভাগের অনুমোদন পেলেই এটি কার্যকর হবে এবং এর আলোকে নতুন লাইসেন্স দেওয়া হবে। আশা করা হচ্ছে, আগস্ট মাসের মধ্যেই অনুমোদন হবে।

এদিকে অপর একটি সূত্র জানায়, তৃতীয় সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানিতে চারটি প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে একটি এসেছে সিঙ্গাপুরের সিংটেলের মাধ্যমে সি-মিই-উই-৬ সাবমেরিন কেবল কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য। অপর তিনটি এসেছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক এসবিএসসিএল, যুক্তরাজ্যের জিও গ্রুপ এবং সিঙ্গাপুরের অপর একটি কোম্পানি সিগমারের কাছ থেকে। এর মধ্যে সিগমার ছাড়া অন্য তিনটি কোম্পানিই সিঙ্গাপুর হয়ে পশ্চিম ইউরোপ, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত। সিগমারের কেবলের দৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম, এটি শুধু সিঙ্গাপুর থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রস্তাবিত চারটি কোম্পানির মধ্যে এসবিএসসিএল-এর প্রস্তাবে ব্যয় সবচেয়ে কম এবং গতি সবচেয়ে বেশি। আর বাংলাদেশ বর্তমানে সি-মিই-উই-৪ এবং সি-মিই-উই-৫ কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যুক্ত আছে। এরই ধারাবাহিকতায় সি-মিই-উই-৬ কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব। তবে এই কনসোর্টিয়ামের এবারের কেবলটি স্থাপনে অন্য প্রস্তাবগুলোর চেয়ে ব্যয় অপেক্ষাকৃত বেশি দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি ২০০৬ সালে প্রথম সাবমেরিন কেবলে  যুক্ত হয়। সি-মিই-উই-৪ কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হওয়ার প্রায় ১১ বছর পর ২০১৭ সালে বাংলাদেশ যুক্ত হয় দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল সি-মিই-উই-৫ কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে। প্রথম সাবমেরিন কেবলের ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন করা হয় কক্সবাজারে এবং দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন করা হয় কুয়াকাটায়। তবে ওই দুটি ল্যান্ডিং স্টেশন এবং ঢাকার সঙ্গে ট্রান্সমিশন লিঙ্ক স্থাপনের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এই দুটি লিঙ্ক স্থাপন নিয়ে সরকারি অডিটেও অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দুটি সাবমেরিন কেবল এবং ছয়টি টেরেস্ট্রিয়াল কেবল থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই ব্যবহারের পরিমাণ দুই হাজার জিবিপিএস (দুই টিবিপিএস) ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে সাবমেরিন কেবলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি বিএসসিসিএল এককভাবে ব্যবসা করছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং অতীতের অনিয়মের রেকর্ডের কারণে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বিএসসিসিএলের ওপর নির্ভর করা যুক্তিযুক্ত নয় বলে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবহারকারীর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে অনুরোধ যায়। এ কারণেই সরকার নতুন নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে সাবমেরিন কেবল ব্যবসা বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলংকায় আরও প্রায় এক দশক আগে থেকেই বেসরকারি খাতে সাবমেরিন কেবল ব্যবসা উন্মুক্ত করা হয়েছে। অবশ্য আরও প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশেরও তিনটি কোম্পানি বেসরকারি খাতে সাবমেরিন কেবল ব্যবসার অনুমতির জন্য আবেদন করেছিল। তখন বিএসসিসিএল-এর ব্যবসায়িক দিক বিবেচনায় এ প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়নি। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, যুক্তিযুক্ত ও সহজ শর্তে বেসরকারি খাতে সাবমেরিন কেবল ব্যবসা উন্মুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রাহকদের সামনে আরও সুলভ মূল্যে আন্তর্জাতিক মানের ইন্টারনেট সেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।