ফের মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন নাছির

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

ঘনিয়ে আসছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নির্বাচন। তিন থেকে চার মাসের মধ্যে ঘোষণা হতে পারে তফসিল। এ হিসাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ফের নির্বাচন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন চসিকের বর্তমান মেয়র আ. জ. ম. নাছির উদ্দীন। গত নির্বাচনের সময় দেওয়া ৩৬ দফা প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা তুলে ধরতে মতবিনিময় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে গিয়ে। এরই মধ্যে 'জনতার মুখোমুখি' নামে অনুষ্ঠান করে মতবিনিময় করেছেন ২১ নং ওয়ার্ডের সঙ্গে। আবার চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন চসিকের সব প্রকৌশলীকে। অসমাপ্ত প্রকল্পগুলোর কোনটির কাজ কত শতাংশ সম্পন্ন হবে, সেটিও উল্লেখ করতে বলেছেন আলাদাভাবে। গত চার বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নগরের কোথায় কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকাও তৈরি করছেন তারা। ফের নির্বাচন করার প্রস্তুতি হিসেবে মেয়র এসব কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন বলে মনে করছেন তার অনুসারীরা।

তবে মেয়রের সফলতা নিয়ে তার দলের মধ্যেই রয়েছে ভিন্নমত। তবু দল মনোনয়ন দিলে ফের নির্বাচন করতে প্রস্তুত আছেন বলে জানালেন মেয়র নিজেও।

'জনতার মুখোমুখি' অনুষ্ঠানে সবার সামনেই সিটি মেয়র আ. জ. ম. নাছির উদ্দীন বলেন, 'দায়িত্ব নেওয়ার পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটা জায়গায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রকল্প এনেছি। নাগরিক সেবা বাড়ানোর ব্যাপারে যেসব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, তার শতভাগ বাস্তবায়ন করেছি। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, সড়কবাতি, নালা-নর্দমা ও রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং সংস্কারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়েছে। নগরীকে বিলবোর্ডমুক্ত করেছি। বর্জ্য সংগ্রহ করছি ঘরে ঘরে গিয়ে। নিজে কোনো অনিয়ম করিনি। এটির সঙ্গে যুক্ত হতে দিইনি আমার দলের লোকদেরও। নগরকে রাতারাতি বদলে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। তাই নিয়মের মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি।' ফের নির্বাচন করবেন কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে আ. জ. ম. নাছির উদ্দীন বলেন, 'আমি প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরি। মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখি। মনে হচ্ছে, মানুষ আমার ওপর আস্থা রেখেছে। এখন দল যদি ফের আস্থা রাখে, প্রস্তুত আছি আমিও। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই আমার কাছে চূড়ান্ত।'

মেয়র হিসেবে গত ২৭ জুলাই পাঁচ বছরে পা রেখেছেন নাছির উদ্দীন। ২৬ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণের চার বছর পূর্ণ হয়েছে তার। গত তিন বছরে তার গৃহীত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যেমন আলোচিত হয়েছে, তেমনি হয়েছে সমালোচিতও। বিলবোর্ডের জঞ্জাল সরিয়ে শুরুতে প্রশংসিত হয়েছেন। অগ্রগতি ছিল পরিচ্ছন্নতা কাজেও। কিন্তু নগরের প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরবাসীকে কোনো  আশা দেখাতে পারেননি। আগের মতো এ বছরও ভারি বর্ষণের পাশাপাশি জোয়ারের পানিতে ডুবতে হয়েছে নগরবাসীকে। এর সঙ্গে বাড়তি দুর্ভোগ হিসেবে যোগ হয়েছে বেহাল সড়ক। শিক্ষা খাতে নীতিমালা করলেও প্রত্যাশিত পরিবর্তন নেই। স্বাস্থ্য খাতও আছে আগের মতো। অথচ জলাবদ্ধতা নিরসনকে এক নম্বরে রেখে শিক্ষার উন্নয়নে সাত দফা, পরিচ্ছন্ন নগর করতে চার দফা, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাত দফা, ডিজিটাল চট্টগ্রাম করতে পাঁচ দফা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি। চট্টগ্রামকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি গড়তে নির্বাচনের আগে দিয়েছিলেন ৩৬ দফা প্রতিশ্রুতি। জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতার কথা মেয়র স্বীকার করলেও সার্বিকভাবে নিজের কাজ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্প সিডিএ বাস্তবায়ন করতে থাকায় এখানে নিজের কোনো ব্যর্থতা দেখছেন না তিনি।

মেয়রের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন বলেন, 'এক সময় নগরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত ময়লা-আবর্জনা। ডাস্টবিন উচ্ছেদ করে ঘরে ঘরে ৯ লাখ ময়লা রাখার প্লাস্টিক বিন দিয়েছেন মেয়র। মেগা প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৯শ' জন সেবক প্রতি রাতেই নগরের ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করছে। যেসব এলাকার ফুটপাত দিয়ে আগে দুর্গন্ধে হাঁটাচলা করা যেত না; সেখানে এসেছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের আওতায় সাজছে নগর। ইতিমধ্যে আন্দরকিল্লা, আউটার স্টেডিয়াম, জামালখান, এয়ারপোর্ট রোড, টাইগারপাস রোড, প্রবর্তক মোড়, লালখান বাজার, কাজীর দেউড়ী ও চট্টেশ্বরী এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে।'

মেয়রের আরেক ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব বলেন, '৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সড়কে নৌকার ওপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃষ্টিনন্দন ম্যুরাল তৈরি করা হয়েছে। জাতিসংঘ পার্ক সংস্কার করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আইটি পার্ক গড়ার কাজও শুরু হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে নীতিমালা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান বাড়াতে ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। নিশ্চয় জনগণ এসব মূল্যায়ন করবে। তাই মেয়র হিসেবেও তারা আবার চাইবেন আ. জ. ম. নাছিরকে।'

তবে মেয়র নাছিরের সফলতা নিয়ে তার দলের মধ্যেই আছে বিকল্প মত। নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। তাঁর এই আবেগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। যিনি দায়িত্বে ছিলেন তিনি আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজে এত বেশি ব্যস্ত ছিলেন যে, নাগরিক সেবার নূ্যনতম চাহিদাও যথাযথভাবে পূরণ করতে পারেননি। অনেক কিছু হয়েছে। কিন্তু আরও অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল। আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলে সেবাধর্মী সব সংস্থাকে এক ছাতাতে এনে জলাবদ্ধতার কষ্টটুকু দূর করা যেত। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যথাযথ নজর পড়েনি। নগরীর বেশিরভাগ সড়ক এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। তিন বছরে পদ্মা সেতু হয়ে যাচ্ছে। অথচ পোর্ট কানেকটিং রোড ও আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোডের সংস্কার কাজ শেষ হয় না। ক্লিন ও গ্রিন সিটির নির্বাচনী স্লোগানও দৃশ্যমান করার সুযোগ ছিল বর্তমান মেয়রের। আসলে কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে, তা খুঁজে বের করতে হবে মেয়রকেই।' কেন্দ্রের সঙ্গে দূরত্ব থাকার ইঙ্গিত দিয়ে প্রবীণ এই নেতা আরও বলেন, 'গাজীপুরের মেয়র পর্যন্ত মূল্যায়িত হন। আর চট্টগ্রামের মেয়র চার বছরেও মন্ত্রিত্বের মর্যাদা পাননি। এখান থেকেই বোঝা যাচ্ছে আগামী নির্বাচনের সমীকরণ।'

তবে মেয়রের অনুসারীরা মনে করছেন, দূরত্ব থাকার এসব আলোচনা স্রেফ গুজব। গত চার বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প আনার সার্থকতা মেয়রের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব না থাকার প্রমাণ বলে জনগণের কাছে উপস্থাপন করছেন তারা। এ জন্য নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের কোথায় কী উন্নয়ন কাজ হয়েছে, সেটির তালিকাও তৈরি করছেন। আ. জ. ম. নাছির ফের মেয়র নির্বাচন করার সুযোগ পেলে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে চট্টগ্রামকে আরও নান্দনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলা সহজ হবে বলে মনে করছেন তারা।