রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটে বাড়ছে কালো টাকা

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে সরকারের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা এখন বিশ্বের কাছে মডেল। প্রতিবছর জিডিপি বৃদ্ধিতে সরকারের সফলতা আশাব্যঞ্জক হলেও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কালো টাকা। সংশ্নিষ্টদের মতে, এই কালো টাকার অন্যতম বড় উৎস দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের অবৈধ সিগারেট বাণিজ্য।

ধূমপানকে নিরুৎসাহিত করতে প্রতিবছর সিগারেটে উচ্চহারে কর ও মূল্যবৃদ্ধি এবং তামাকের ব্যবহার বন্ধসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তার আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেট থেকে প্রতিবছর প্রচুর

পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, ব্যাহত হচ্ছে সরকারের ধূমপায়ীর সংখ্যা কমানোর লক্ষ্য।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে অবৈধ সিগারেটের প্রায় ৯০ শতাংশই রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হচ্ছে। রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের এই বাজার দিন দিন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা অবৈধ সিগারেটের কারখানাগুলো। নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসব সিগারেটের বাজার থেকে সরকার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে, যা তামাক খাত থেকে পাওয়া মোট রাজস্বের প্রায় ১০ শতাংশ।

অবৈধভাবে উৎপাদিত এই সিগারেটের বাজার থেকে প্রতিবছর সরকার যে রাজস্ব হারাচ্ছে তার পুরোটাই কালো টাকা, যা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। দেশের অর্থনীতিতে কালো টাকার বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আনু মুহাম্মদ বলেন, 'কালো টাকা বলতে সেই সম্পদ বা আয়কে বোঝায় যে সম্পদ বা আয়ের বিপরীতে কর প্রদান করা হয়নি।' সমাজে কালো টাকার প্রসার বাড়লে দুই ধরনের সমস্যা হয় বলে তিনি মনে করেন। এক. কালো টাকা বেড়ে যাওয়ায় প্রচুর পরিমাণে রাজস্ব হারায় সরকার। দুই. যারা সৎ বিনিয়োগকারী তারা কালো টাকার সঙ্গে ব্যবসায় পেরে উঠতে পারেন না। ফলে অর্থনীতিতে ভারসাম্য নষ্ট হয় ও সমাজে

বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

দেশের কালো টাকার একটি বড় অংশ আসছে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের বাজার থেকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'সরকার সিগারেটের দাম বাড়ানোর কারণে অবৈধ সিগারেটের বাজার বৃদ্ধি পাচ্ছে, একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে বেড়ে যাচ্ছে কালো টাকার পরিমাণ। তাই সরকারের উচিত হবে ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে একদিকে সিগারেটের দাম বৃদ্ধি করা, অন্যদিকে অবৈধ সিগারেটের বাজার বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।'

অপরদিকে অর্থনীতিবিদ নুরুল হুদা বলেন, 'দেশব্যাপী বিভিন্ন অসাধু উৎপাদনকারী সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যেসব সিগারেট উৎপাদন করে তাদের পরিবেশ ছাড়পত্র এবং লাইসেন্সসহ বৈধতার লেশমাত্রও নেই। বরং এখানে ট্যাক্স স্ট্যাম্প নকল করার মাধ্যমে টাকা জাল করার মতো বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।'

সংশ্নিষ্টদের মতে, রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া এই অবৈধ সিগারেটের বাজারসহ বিভিন্ন খাত থেকে যে কালো টাকা আসে তার বেশিরভাগই ব্যবহূত হতে পারে জঙ্গি অর্থায়নসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। এ ব্যাপারে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলম বলেন, 'যখন কোনো অবৈধ উৎস থেকে অর্থ আয়ের সুযোগ তৈরি হয় তখন সেই অর্থ ব্যবহারও হয় অবৈধ কোনো কর্মকাণ্ডে এবং সরকার ও দেশ বিদ্রোহী বিভিন্ন কার্যক্রমে। তাই দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে এবং সরকারবিরোধী কার্যক্রম বন্ধে অতিদ্রুত কালো টাকার উৎস বন্ধ করা দরকার।' তিনি আরও বলেন, তামাক খাতসহ কালো টাকা আয়ের উৎস বন্ধে সরকারের আরও কঠোর নজরদারিসহ বিভিন্ন উপায়ে এই উৎসগুলো রুখতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের বাজার থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, তা সমন্বিতভাবে রোধ করা গেলে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ আরও ত্বরান্বিত হবে। এটা রোধ করা না গেলে অর্থ পাচারের হারও বাড়বে।