ওয়ার্কার্স পার্টিতে আবারও ভাঙন?

মেননের বক্তব্য নিয়ে বিস্ময় ১৪ দলে

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০১৯      

অমরেশ রায়

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিতে চরম সংকট চলছে। দলের দশম কংগ্রেস সামনে রেখে কয়েকজন নেতার 'ভিন্নমত' এবং ১৪ দল থেকে সরে আসতে দলীয় নেতৃত্বের প্রতি চাপ সৃষ্টিই এ সংকটের কারণ। মতবিরোধের জের ধরে কয়েকজন নেতা দল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। এ অবস্থায় দেশের অন্যতম বামপন্থি এই দলটিতে আরেক দফা ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এরই মধ্যে দলের অভ্যন্তরে আর্থিক অনিয়ম এবং বিভিন্ন জেলায় সদস্য সংগ্রহে গঠনতন্ত্র না মানাসহ নানা অভিযোগ এনে কংগ্রেস বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের যশোর জেলা কমিটি। আপত্তি এসেছে রাজশাহী, বগুড়াসহ আরও কয়েকটি জেলা থেকেও। দশম কংগ্রেসে নানা অভিযোগ নিয়ে সোচ্চার হওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন কেউ কেউ।

এদিকে, 'গত নির্বাচনে জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি'- রাশেদ খান মেননের এমন বক্তব্যে বিস্ময় দেখা দিয়েছে ১৪ দলে। হঠাৎ করে তিনি কেনই-বা একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এমন বক্তব্য দিলেন, সেটা নিয়ে অনেক নেতাই প্রশ্ন তুলছেন।

এ প্রসঙ্গে ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম এমপি সমকালকে বলেছেন, রাশেদ খান মেনন একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। নির্বাচন নিয়ে তার এমন অসত্য বক্তব্য সত্যিই দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। অনেক প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করেই নির্বাচন হয়েছে এবং সরকার গঠনও করা হয়েছে। তা ছাড়া মেনন ও তার স্ত্রীও এই সংসদের সদস্য। সে অবস্থায় তিনি এমন বক্তব্য দিয়ে নিজেকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, তেমনি ১৪ দলকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার এমন বক্তব্যের সঙ্গে ১৪ দলের কোনো সম্পর্ক নেই। ১৪ দলের পক্ষ থেকে তার এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

মেননের বক্তব্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টিতেও। কংগ্রেস সামনে রেখে 'ভিন্নমত' উপস্থাপনকারী নেতারা এ নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও অন্যরা নাখোশ হয়েছেন দলীয় প্রধানের বক্তব্যে। যদিও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে বলেছেন, তার বক্তব্য সম্পর্কে জাতীয় ও ১৪ দলের রাজনীতিতে একটা ভুল বার্তা গেছে। তার বক্তব্য সম্পূর্ণ উপস্থাপন না করে অংশবিশেষ উত্থাপন করায় এ বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। আজ মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতার যে বিপদ বিদ্যমান, তাকে মোকাবিলা করতে ১৪ দলের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।

১৪ দল ও সরকারে থাকা-না থাকার প্রশ্নে আগে থেকেই ওয়ার্কার্স পার্টিতে মতাদর্শগত বিরোধ চলে আসছিল। সর্বশেষ দলীয় ফোরামে আলোচনা ছাড়াই দলীয় সভাপতি রাশেদ খান মেননের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা খান বিউটিকে দলের কোটায় একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা এমপি নির্বাচিত করা এবং দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিল না করাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধ আরও দানা বাঁধে। যার রেশ ধরে সারাদেশে দলটির ৫৩টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির একটি বড় অংশ বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারিয়েছে।

আগামী ২ থেকে ৫ নভেম্বর ওয়ার্কার্স পার্টির চার দিনব্যাপী দশম কংগ্রেস ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। ২ নভেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কংগ্রেসের উদ্বোধন শেষে ৩ থেকে  ৫ নভেম্বর কাউন্সিল চলবে মতিঝিলের সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে।

এই কংগ্রেস সামনে রেখে গত জুন মাসের প্রথম দিকে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সারাদেশের শাখা কমিটিগুলোতে দশম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাব ও সাংগঠনিক দলিলপত্র পাঠানো হয়েছিল। দলিলের বক্তব্যের অংশবিশেষের ভিন্নমত দিয়েছেন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটব্যুরোর দুই সদস্য নুরুল হাসান ও ইকবাল কবির জাহিদ। ওয়ার্কার্স পার্টির ১৪ দলের শরিক হিসেবে থাকা এবং দলীয় প্রতীক 'হাতুড়ি' ছেড়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করাটাই তাদের মূল আপত্তির বিষয়। এ ভিন্নমতে দলীয় সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকা এবং স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গে জোট ও সরকারে অংশ নিয়ে নেতৃত্ব মহলবিশেষের স্বার্থ চরিতার্থ করার মাধ্যমে দল গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

লিখিত অভিযোগে কেন্দ্রীয় কমিটির গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও ভিন্নমত তুলে ধরেছেন নুরুল হাসান ও ইকবাল কবির জাহিদ। বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছেন ১১ সদস্যের পলিটব্যুরোর আরও দুই সদস্য। যাদের মধ্যে দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস চলতি সপ্তাহেই দল থেকে নিজের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২২ অক্টোবর বিমল বিশ্বাস লিখিত বক্তব্য দিয়ে দল ও গণমাধ্যমে পাঠানোর মাধ্যমে দল থেকে সরে আসবেন বলে জানা গেছে।

পলিটব্যুরোর একজন সদস্য জানান, দলের সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশাসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দলের মতাদর্শ, রণনীতি, লেনিনীয় নীতি, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও অভিমতকে উপেক্ষা করার অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় নিয়েও দলের দশম কংগ্রেস উত্তপ্ত হয়ে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, দলীয় নেতৃত্ব ধরে রাখতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দলীয় গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে সদস্য সংগ্রহ করে কংগ্রেসে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর চেষ্টাও করছেন। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দলের সর্বশেষ কংগ্রেসে রাজশাহীতে ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য ছিল ৪৫০ জন। এখন সেখানে সদস্য করা হয়েছে এক হাজার ১০০ জনকে। রাজশাহীর মতো ঢাকা মহানগরেও গঠনতন্ত্রের ধারা না মেনে আগের ১৫০ জনের পরিবর্তে সদস্য করা হয়েছে ৪৫০ জনকে। বগুড়ায় আগের ১১৩ জনের সঙ্গে নতুন করে সদস্য করা হয়েছে আরও ৪০ জনকে।

কয়েকজন নেতার অভিযোগ, দশম কংগ্রেস সামনে রেখে সারাদেশে কমিটি গঠন হলেও সেটা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এ নিয়ে বগুড়া, মাদারীপুর ও পিরোজপুর জেলার নেতারা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া দলে উত্থাপিত ভিন্নমতকে এড়িয়ে যাওয়ারও সব রকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কংগ্রেস সামনে রেখে ভিন্নমত পোষণকারীদের এভাবে কোণঠাসা করতে গেলে দল নিশ্চিত ভাঙনের মুখে পড়বে।

দলের পলিটব্যুরোর সদস্য ও যশোর জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি ইকবাল কবির জাহিদ বলেছেন, গঠনতন্ত্রের নিয়মকানুন ভঙ্গ করে বিভিন্ন জেলায় বিএনপি-আওয়ামী লীগের মতো গণসদস্য দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার অপকৌশল নেওয়া হয়েছে। রাজশাহী, ঢাকা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এ কাজ সুকৌশলে সম্পাদন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দলের মধ্যে এখন টানাপোড়েন চলছে। বৈধ প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে দলের কংগ্রেস হবে কি-না এবং হলেও প্রহসনে পরিণত হবে কি-না, তা নিয়েই এক ধরনের সংশয়ও দেখা দিয়েছে।

পলিটব্যুরোর সদস্য নুরুল হাসান বলেন, তারা কংগ্রেসে থাকবেন। তাদের বক্তব্যও তুলে ধরবেন। তবে দল ভাঙার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন না।

দলের সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, দলে উত্থাপিত ভিন্নমত স্বাভাবিক। এ নিয়ে কেউ যদি দল ভাঙতে চায়, ভাঙুক। তবে এ ইস্যুতে ওয়ার্কার্স পার্টি ভাঙার কোনো সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন না তিনি।

১৯৯২ সালে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, সাম্যবাদী দল ও ওয়ার্কার্স পার্টির সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এর আগে তিন দফায় ভাঙনের শিকার হয়েছে। ১৯৯৪ সালে টিপু বিশ্বাসের নেতৃত্বে একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে 'জাতীয় গণফ্রন্ট' নামে আলাদা দল গঠন করে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রশ্নে সৃষ্ট মতবিরোধের জের ধরে ২০০৪ সালের জুন মাসে সাইফুল হকের নেতৃত্বে একটি অংশ বের হয়ে আলাদা দল গঠন করে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি নামে পরিচিত। পরে ১৪ দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন ও সরকারে যোগদানের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দলের পলিটব্যুরোর আরেক সদস্য হায়দার আকবর খান রনোর নেতৃত্বে একটি অংশ দল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠিত) নামে আলাদা দল গঠন করে। অবশ্য রনো পরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে (সিপিবি) যোগ দিয়ে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। এর বাইরেও বুর্জোয়া দলের সঙ্গে ঐক্যের বিরোধিতা করে সাম্প্রতিককালে দলের কয়েকজন নেতাও দল ছেড়ে গেছেন অথবা নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।