পায়রাবন্দের স্মৃতিকেন্দ্রটি চালু হয়নি দেড় যুগেও

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯      

হাবিবুর রহমান সোনা, মিঠাপুকুর (রংপুর)

আজ ৯ ডিসেম্বর। ভারতীয় উপমহাদেশে নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু দিবস। রোকেয়ার জন্মস্থান রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দের নারীরা এখন অনেক অগ্রসর। সেকালের মতো বন্দিজীবন নেই, মেয়েরা এখন দল বেঁধে স্কুল-কলেজে যায়। বাল্যবিয়ে তেমন একটা নেই। অসচ্ছল পরিবারের নারীরা কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে অর্থ উপার্জন করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। বেগম রোকেয়ার স্মৃতি রক্ষার্থে পায়রাবন্দে ১৮ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিকেন্দ্র। এত বছরেও অজানা কারণে তা চালু হয়নি। এ নিয়ে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। এবারে রোকেয়া দিবসে এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি, বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি চালু করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

পায়রাবন্দে ২০০১ সালের ১ জুলাই ৩ একর ১৫ শতক জমির ওপর নির্মিত রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন পায়রাবন্দকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম পাদপীঠ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

সরেজমিন পায়রাবন্দে গিয়ে দেখা গেছে, স্মৃতিকেন্দ্রে একটি রেস্টহাউস, অডিটোরিয়াম, সেমিনার কক্ষ, লাইব্রেরি, গবেষণাগার, সংগ্রহশালা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নামাজ ঘর ও স্টাফ কোয়ার্টার রয়েছে। মূল ভবনের সামনে পিতলের তৈরি বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য রয়েছে। এ কেন্দ্রে কর্মরত আছেন একজন উপপরিচালকসহ সাত কর্মকর্তা-কর্মচারী।

রোকেয়ার জীবন-কর্ম সম্পর্কে গবেষণা, তার গ্রন্থাবলির অনুবাদ, প্রচার ও প্রকাশনা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং স্থানীয় যুবকদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণদানের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে নানা প্রতিকূলতায় এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি।

স্মৃতিকেন্দ্রটি ২০০৮ সালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই বছরের ১৭ মার্চ বিকেএমইর শ্রমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। স্মৃতিকেন্দ্রটির মূল উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে সেখানে পোশাক শ্রমিক তৈরির প্রশিক্ষণ শুরু করায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা।

পায়রাবন্দ স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ মিলে বিকেএমইকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। উচ্চ আদালত বেগম রোকেয়ার স্মৃতিকেন্দ্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং শ্রমিক তৈরির কারখানা বন্ধের আদেশ দেন। পরে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন বিকেএমইকে উচ্ছেদ করে। তখন থেকে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ থাকার পর সম্প্রতি সংগীত প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। তবে স্মৃতিকেন্দ্রের মূল কার্যক্রম চালু হয়নি।

এ ব্যাপারে স্মৃতিকেন্দ্রের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল-ফারুক বলেন, স্মৃতিকেন্দ্রের কার্যক্রম এখনও চালু হয়নি। আপাতত সংগীত প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে। সংগীত বিষয়ে ৪০ জন ছাত্রী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য চুক্তিভিত্তিক দু'জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যদিও তারা এখনও কোনো বেতন পাননি।

এ ব্যাপারে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন ভূঁইয়া বলেন, বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের জটিলতা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নিষ্পত্তি হয়েছে। এখন এটির কার্যক্রম চালাতে আর কোনো বাধা নেই।

জীবনী ও কর্ম :বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালে পায়রাবন্দের সল্ফ্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জহির উদ্দিন সাবের চৌধুরী ছিলেন একজন জমিদার। ওই পরিবারে নারী শিক্ষা ছিল একেবারে নিষিদ্ধ। কিন্তু রোকেয়া তার ভাইয়ের সহযোগিতায় গোপনে শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৮৯৮ সালে ১৬ বছর বয়সে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। নারীদের শিক্ষা বিস্তারে তিনি ১৯১১ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তার উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সুলতানার স্বপ্ন, মতিচুর, অবরোধ বাসিনী, পদ্মরাগ ইত্যাদি। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন বেগম রোকেয়া।