কঙ্গোর চিকিৎসা সেবায় বাংলাদেশি মডেল

শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমানো, জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধারণা

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

সাহাদাত হোসেন পরশ, ডিআর কঙ্গোর ইতুরি থেকে

কঙ্গোর চিকিৎসা সেবায় বাংলাদেশি মডেল

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসা নিচ্ছেন ডিআর কঙ্গোর বাসিন্দারা- সমকাল

একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে মানুষ গবেষণা করছে কীভাবে চাঁদের বুকে বসতি স্থাপন করা যায়। প্রাণঘাতী ক্যান্সার জয় করতেও চলছে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা। চিকিৎসা শাস্ত্রে দুনিয়ার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে কতই না বিপ্লব ঘটছে। বিজ্ঞানের বিকাশের এই সময়েও পৃথিবীর একটি প্রান্ত যে সত্যিকার অর্থেই অন্ধকারের নিকষ আঁধারে ঢাকা। প্রাথমিক চিকিৎসা, রোগ ও মানব স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে নূ্যনতম ধারণাও তাদের নেই। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার আগে বা পরে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়- এমনটি বিশ্বাস করতে চান না ডিআর কঙ্গোর অধিকাংশ নারী। বহুকাল ধরে হোম ডেলিভারির মাধ্যমে এখানে সন্তান জন্ম হচ্ছে। এতে প্রায়ই ঘটছে শিশুমৃত্যুর ঘটনা। ঘটছে মাতৃমৃত্যুও। আর কিশোরী বয়সের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সাধারণ কঙ্গোলিজদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। দেশটির একটি বড় জনগোষ্ঠী জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সামান্যতম চিকিৎসা সুবিধাও পায় না। তবে ডিআর কঙ্গোর একটি অংশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। বাংলাদেশ যেভাবে মাতৃ, শিশুমৃত্যু হার কমিয়েছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ করেছে- সেই অভিজ্ঞতা কঙ্গোর মানুষকে জানানো হচ্ছে। চিকিৎসা সেবায় 'বাংলাদেশি মডেল' প্রয়োগে এরই মধ্যে ডিআর কঙ্গোয় অনেক সুফলও মিলতে শুরু করেছে।

কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের বুনিয়ায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করছেন ডা. মেজর রেজওয়ানা ইসলাম। তিনি সমকালকে জানান, কঙ্গোর একটি বড় অংশের বাসিন্দার সাধারণ চিকিৎসা সেবা সম্পর্কে নূ্যনতম ধারণা নেই। অধিকাংশ এলাকার অন্তঃসত্ত্বারা জানেন না এই সময় চিকিৎসকের নানা পরামর্শ নিতে হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীও তারা ব্যবহার করেন না। এসব ব্যাপারে তাদের সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে রেজওয়ানা জানান, বুনিয়া এলাকার এক নারীর পরপর তিন দফায় গর্ভপাত হয়। কেন, কী কারণে গর্ভপাত হতে পারে সেই সম্পর্কে ওই নারীর কোনো ধারণাই ছিল না। পরে তাকে ওই বিষয়ে বুঝিয়ে বলা হয়। এর পরও তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ডিআর কঙ্গোর সাধারণ মানুষের কাছে একমাত্র আতঙ্ক এইডস। তারা শুধু এইডসের ব্যাপারে জানতে চায়। তবে সম্প্রতি ইবোলা ভাইরাস নিয়েও তাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ছড়িয়েছে। আবার কেউ কেউ এমনও বিশ্বাস করেন- ইবোলা বলে কিছু নেই। ইবোলা একটি গুজব। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কঙ্গোয় সরকারিভাবে চিকিৎসা সেবার মান অত্যন্ত দুর্বল। বহু দুর্গম এলাকায় চিকিৎসক ও ওষুধ দুষ্প্রাপ্য। বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র এই রাষ্ট্রে এইচআইভি ও যৌন সংসর্গজনিত রোগের হারও অনেক বেশি। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মেডিকেল টিমের সদস্যরা কঙ্গোর জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাখছেন প্রশংসনীয় ভূমিকা। 'দুটি সন্তানের বেশি নয়' এই ধারণা ডিআর কঙ্গোর সাধারণ মানুষকে দিয়ে আসছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মেডিকেল টিমের সদস্যরা। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সম্পর্কে তারা দিচ্ছেন সম্যক জ্ঞান। কীভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমিয়ে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে- শোনানো হচ্ছে সফলতার সেই গল্প। শিশুদের টিকা সম্পর্কে দেওয়া হচ্ছে ধারণা। এ ছাড়া শান্তিরক্ষীরা মেডিকেল ক্যাম্প তৈরি করে ডিআর কঙ্গোর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিতরণ করছেন নানা ধরনের ওষুধ।

কঙ্গোর সাধারণ জনগোষ্ঠী যেখানে ছোটখাটো চিকিৎসা সেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত, সেখানে কারাবন্দিদের চিকিৎসার হাল কতটা নাজুক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বুনিয়ার কারাগারে একজনও সরকারি চিকিৎসক নেই। প্যারামেডিকস থাকলেও সেখানে অনুপস্থিত প্রয়োজনীয় ওষুধ। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা কঙ্গোর বুনিয়ার কারাবন্দিদের চিকিৎসা সেবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই মধ্যে বুনিয়ার শহরের জেলখানায় বন্দিদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা।

কঙ্গোর জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবায় আরও যেসব উদ্যোগ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা নিয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন হেলথ সেন্টারে গিয়ে ওষুধ সরবরাহ। জাতিগত সংঘাতের শিকার হয়ে যেসব শিশু তাদের মা-বাবা হারিয়েছে, ওই শিশুদের বিভিন্ন এতিমখানায় রাখা হয়। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মেডিকেল টিমের সদস্যরা স্থানীয় এতিমখানায় গিয়ে শিশুদের চিকিৎসা সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে আসছেন। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা কখন মেডিকেল ক্যাম্প তৈরি করবেন, কখন তারা সেবা পাবে- এতে উন্মুখ হয়ে থাকে অনেক স্থানীয় জনগোষ্ঠী।

গত ৬ ডিসেম্বর বুনিয়ার এনড্রোমো ক্যাম্পের খেলার মাঠে একটি মেডিকেল ক্যাম্প করেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। ওই ক্যাম্পে চিকিৎসা নিতে আসেন বুনিয়ার স্থানীয়রা। সুশৃঙ্খলভাবে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে একে একে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ নিয়ে খুশিমনে বাড়ি ফিরছিলেন স্থানীয়রা। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসা নিতে আসেন সিসিলেন (২১)। স্থানীয় এই নারীর সঙ্গে ছিলেন তার স্বামী জিদান ও দুই সন্তান। সিসিলেন জানান, তিনি সন্তানসম্ভবা। এই সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়- এটা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী চিকিৎসকের কাছে জেনেছেন। এ ছাড়া তার ঠান্ডাজনিত সমস্যা রয়েছে। এর আগেও কয়েক দফায় বাংলাদেশের মেডিকেল ক্যাম্পে তিনি চিকিৎসা নিয়েছেন।

ডিআর কঙ্গোয় নিযুক্ত র‌্যাপিডলি ডেপ্লয়অ্যাবল ব্যাটালিয়নের (ব্যানআরডিবি) কন্টিনজেন্ট কমান্ডার কর্নেল ইমতাজ উদ্দিন জানান, চিকিৎসা সেবার ব্যাপারে দুই ধরনের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এক, শহুরে এলাকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে কর্মসূচি গ্রহণ। এর কারণে স্বাস্থ্য সেবার ধারণা বদলাতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দুই, দুর্গম এলাকায় মেডিকেল ক্যাম্প তৈরির ব্যাপারে জোর দেওয়া। কারণ সেখানে কোনো ডাক্তার ও ওষুধ পান না স্থানীয়রা। কঙ্গোর সুবিধাবঞ্চিত একটি বড় জনগোষ্ঠীর কাছে বাংলাদেশ এক আশীর্বাদ। ইমতাজ উদ্দিন আরও জানান, শুধু কঙ্গোর সাধারণ জনগোষ্ঠী নয়, এ দেশের সেনা ও পুলিশ সদস্যদেরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মেডিকেল টিম।

সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের অংশ হিসেবে ৭ ডিসেম্বর বুনিয়ার একটি গ্রামে গিয়ে খাবার, পোশাক, ওষুধ, বিস্কুটসহ নানা ধরনের সামগ্রী বিতরণ করেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা। এ সময় সেখানে জড়ো হন শত শত স্থানীয় শিশু-নারী-পুরুষ। স্থানীয় শিশুরা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের দেখলেই সাধারণত একটি বিষয় চেয়ে নেয়। সেটি হলো 'কলম'। ডিআর কঙ্গোতে কলম অনেক দামি জিনিস। স্কুলগামী অধিকাংশ শিশুর কলম কেনার সামর্থ্য নেই। তাই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা গ্রামে গেলেই অনেক কলম নিয়ে যান। বুনিয়ার গ্রামে যাওয়ার পর বাংলায় গান গেয়ে স্থানীয় কয়েকজন উপস্থিত বাংলাদেশিদের মুগ্ধ করেন। গ্রামবাসীর সঙ্গে অনাড়ম্বরপূর্ণ ওই অনুষ্ঠান শেষে যখন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা আবার ক্যাম্পে ফিরে আসছিলেন, তখন ডিআর কঙ্গোর শিশুরা বাংলায় বলছিল-'বন্ধু, আবার এসো।'