বাংলাদেশের স্থলভাগ ও জলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন ও সরবরাহে কাজ করবে রাশিয়ার তেল-গ্যাস কোম্পানি গ্যাজপ্রম। দরপত্র ছাড়া পৃথক চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানিটি নিজে বা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে এসব কাজ করতে পারবে। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে গ্যাজপ্রম। রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজার পেট্রোসেন্টারে এমওইউ দুটি সই হয়।

ভোলায় প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় গ্যাজপ্রম বাপেক্সকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিমাত্রিক, ত্রিমাত্রিক জরিপ, সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করবে। এর মধ্যে ৬০০ বর্গকিলোমিটারে বাপেক্স আগেই জরিপ চালিয়েছে। প্রাপ্ত ডাটার মালিকানা বাপেক্সের থাকবে। জরিপের প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর গ্যাস উত্তোলন ও অনুসন্ধানে কূপ খনননের বিষয়ে আলোচনা

হবে। সরকার ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভোলায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ১২শ' কোটি টাকা বিনিয়োগের

পরিকল্পনা নিয়েছে।

চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম সাংবাদিকদের বলেন, গ্যাজপ্রমের সঙ্গে মূলত দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একটি ভোলা গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন, কূপ খননসহ যাবতীয় কাজে বাপেক্সের সঙ্গে কাজ করবে গ্যাজপ্রম। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলে পাইপলাইন স্থাপনসহ গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য কাজও তারা করতে পারবে। বর্তমানে ভোলায় তিনটি ক্ষেত্র আছে। এ ক্ষেত্রটি আরও উত্তর দিকে বিস্তৃত থাকতে পারে। সেটিও খুঁজে দেখবে তারা। তিনি জানান, অন্য চুক্তিটি হচ্ছে গ্যাজপ্রমের সঙ্গে পেট্রোবাংলার। এই চুক্তির আওতায় গভীর সমুদ্র অঞ্চল থেকে শুরু করে পার্বত্য এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে তারা কাজের আগ্রহ দেখাতে পারে। এমনকি এসব কাজের জন্য ত্রিমাত্রিক জরিপও করতে পারে। জ্বালানি খাতের অনুসন্ধান, উন্নয়নকাজে পেট্রোবাংলার স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে কাজ করতে পারবে। উপদেষ্টা বলেন, গ্যাজপ্রম বিশ্বের বহু দেশের

জ্বালানি খাতে কাজ করছে। তারা ইউরোপ, জার্মানিসহ অনেক দেশেই এখন এলএনজি সরবরাহ, পাইপলাইন স্থাপন করেছে।

বাপেক্সের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন গ্যাজপ্রমকে ভোলার গ্যাসক্ষেত্রের কাজ দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, বাপেক্স আগের চেয়ে অনেক দক্ষ। এ সরকারের আমলে চারটি রিগ (খনন যন্ত্র) কেনা হয়েছে। ফলে তাদের সক্ষমতা নেই, আমরা তা বলছি না। বাপেক্স পারবে, কিন্তু সেটি সময়সাপেক্ষ। দেশের উন্নয়ন করতে চাইলে দ্রুত জ্বালানির প্রয়োজন। দ্রুত জ্বালানি আনতে হলে প্রযুক্তিরও সহায়তা লাগবে। এর দুটিই গ্যাজপ্রমের আছে। তাই আমরা বাপেক্সের পাশাপাশি গ্যাজপ্রমকে কাজ দিয়েছি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, ২০১২ সালের পর থেকে বিনা দরপত্রে দেশে ১৫টি কূপ খনন করে গ্যাজপ্রম। বেশি দামে দেওয়া হলেও এসব কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলনের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। কূপপ্রতি গড়ে গ্যাজপ্রম নিয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। আর বাপেক্সের খরচ ৬০ কোটি থেকে ৮০ কোটি টাকা। ভোলা প্রমাণিত গ্যাসক্ষেত্র, মালিকানা বাপেক্সের। কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল বাপেক্সের আছে। আর্থিক সমস্যাও নেই। তা সত্ত্বেও কেন বাপেক্সকে রেখে অন্য কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, যৌথ অংশীদারিত্বে গ্যাস উত্তোলন করলে সেই গ্যাস বেশি দামে কিনতে হবে। বাপেক্স তুললে সাশ্রয়ী হতো। তবে সমুদ্রে ও পাহাড়ে গ্যাজপ্রমের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা যেতে পারে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জ্বালানি বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আনিছুর রহমান, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান

এবিএম আব্দুল ফাত্তাহসহ পেট্রোবাংলা, বাপেক্স ও গ্যাজপ্রমের প্রতিনিধিরা। চুক্তি সইয়ের পর গতকাল সন্ধ্যায় সংসদ ভবনে গ্যাজপ্রম প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার আই ইগনাতভ, গ্যাজপ্রম পিজিএসসির ডেপুটি ডিরেক্টর মার্কেলভ ভিটালি, গ্যাজপ্রম ইপি ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তুমানভ সার্গেই, এআরএমএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিরুদ্ধ রায় প্রমুখ।

মন্তব্য করুন