ব্র্যাকের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

প্রাথমিকের শিশুদের পঠন দক্ষতা বাড়াতে হবে

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০      

সমকাল প্রতিবেদক

প্রাথমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন শিশু শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা বাড়ানো। গত কয়েক বছরে এ স্তরের শিশুদের পঠন দক্ষতা আশাব্যঞ্জকভাবেই বেড়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আন্তরিকতা, তাদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার উপকরণগুলো যথাসময়ে তাদের হাতে পৌঁছানো জরুরি। শিক্ষকরা উদ্যমী না হলে শিশুরা পঠনে (রিডিং পড়া) পিছিয়ে থাকবে। আবার অনেক শিশু সাবলীলভাবে পড়তে পারলেও উচ্চারণে আঞ্চলিকতা থেকে যাচ্ছে। এ সমস্যা শিক্ষকদেরও। বাংলা ও ইংরেজি পঠনে শিশুদের দক্ষতা বাড়াতে প্রয়োজনে শিক্ষাক্রমের সংশোধনও করতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক আয়োজিত 'প্রাথমিক শিক্ষায় গুণগত অগ্রগতি'- শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আলোচনায় পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা

হয়, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রথম শ্রেণি পড়ূয়া শিশুরা প্রতি মিনিটে ৪১টির বেশি শব্দ রিডিং পড়তে পারে। আর তৃতীয় শ্রেণির শিশুরা মিনিটে ৭৩ শব্দের বেশি পড়তে পারে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলা রিডিং পড়ার ব্যাপারে এখনও কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা নেই। তবে আন্তর্জাতিকভাবে ইংরেজি ভাষা পড়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের জন্য মিনিটে ৪৮ শব্দ নির্ধারণ করা আছে। এ কারণে আমাদের দেশে বাংলায় প্রতি মিনিটে ৪৫ শব্দ নির্ধারণ করা হয়।

গোলটেবিল আলোচনায় দেশের শিক্ষক, শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের পাশাপাশি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, দাতা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কর্মকর্তারাও অংশ নেন। আলোচনায় 'ইনোভেশন ফর ইমপ্রুভিং আর্লি গ্রেড রিডিং অ্যাকটিভিটি প্রজেক্ট'-এর অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হয়।

রাজধানীর গুলশানে বেঙ্গলি ইন হোটেলে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হোসেন বলেন, এক বছর চার মাস আগে আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশে প্রাথমিকের শিশুরা ইংরেজি তো বটেই, বাংলায়ও শুদ্ধভাবে রিডিং পড়তে পারে না। এখন মিনিটে ৭৩ শব্দ সাবলীলভাবে রিডিং পড়তে পারছে শিশুরা, এটা আমাদের জন্য গর্বের।

তিনি বলেন, প্রাথমিক ৪৭ দশমিক ৬ ভাগ শিশু ড্রপ আউট হতো। এর কারণ, দারিদ্র্য ও বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা না দেওয়া। এ থেকে উত্তরণে আমরা স্কুল ফিডিং কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। ক্লাসরুম শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করতে একাধিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সারাদেশের ৬৫ হাজার ৬২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কোটি ৪০ লাখ শিশুই যেন শুদ্ধভাবে বাংলা ও ইংরেজি পড়তে পারে, সেটিই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান সচিব।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেন, শিশুর বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রাথমিকের কারিকুলাম ও পাঠ্যবই হতে হবে। আমরা দেখেছি, কারিকুলামে তেমন সমস্যা নেই। সমস্যা আছে শিক্ষকদের পাঠদানে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, লিখতে, পড়তে, জানতে এবং বুঝতে পারার নামই শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষায় আমরা ব্যর্থ হলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমাদের হাতে কোনো জাদুর বাক্স নেই। ভালো পাঠ্যক্রম, ভালো বই, ভালো শিক্ষক দিয়েই প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্মত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বলেন, তাড়াহুড়ো করলে ভালো কাজ করা কঠিন। একটা কাজের মজবুত ভিত্তি দেখতে চাইলে সময় দিতে হবে। পঠনের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও অনেক উপকরণ যুক্ত, সেদিকে নজর দিতে হবে।

ইউএসএইডের অফিস ডিরেক্টর জারসেস সিধা বলেন, প্রি-প্রাইমারি শিক্ষা খুব জরুরি। এই প্রকল্পের সফলতার গল্প শুনে উৎসাহিত হলাম। এখানে ছোট ছোট সহজ শিক্ষা উপকরণ ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করা হয়েছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রজেক্ট ম্যানেজার শাহীন ইসলাম বলেন, প্রচলিত শিক্ষা কার্যক্রমে সবকিছু থাকলেও শিক্ষার্থীরা তা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করছে না। সেভ দ্য চিলড্রেন ছোট ছোট, কিন্তু কার্যকর পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াতে সহযোগিতা করেছে। এতে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে সুনিপুণভাবে পড়তে পারছে।

সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের অধ্যক্ষ ব্রাদার রবি পিউরিফিকেশন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় কমিউনিটির সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, না হলে টেকসই পরিবর্তন আসবে না।

ইউএসএইডের প্রোগ্রাম বিশেষজ্ঞ আলী মোহাম্মদ শহীদুজ্জামান বলেন, আমরা একের পর এক প্রকল্প নিই, সেগুলোর সফলতার গল্প শুনি। প্রকল্প শেষ, সব শেষ। এই সফলতা ধরে রাখার বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে।

বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসিমা আক্তার বলেন, তিনি মাঠে গিয়ে এই প্রকল্পের সাফল্যের প্রমাণ পেয়েছেন। স্কুলের বাচ্চারা সাবলীলভাবে বাংলা পড়ছে। ধর্মীয় বইয়ের শব্দগুলো সাধারণত কঠিন হয়। কিন্তু সেটা তাদের পঠনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। এটা সম্ভব হয়েছে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বাড়তি সময় দিয়েছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রি-প্রাইমারি) মহিউদ্দিন আহমেদ তালুকদার বলেন, ভালো বাংলা শিখতে হলে চর্চা করতে হবে। আমাদের শিক্ষকদের সক্ষমতা কম ছিল। তাদের দক্ষতার উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। পঠন দক্ষতা বাড়াতে সরকারের পাশাপাশি সহযোগী সংস্থার ভূমিকা প্রয়োজন।

রুম টু রিডের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাকিনা খানম বলেন, প্রাথমিকের শিশুদের শিক্ষকের সহায়তা ছাড়া স্বাধীনভাবে লিখতে ও পড়তে জানতে হবে। শুধু রিডিং পড়তে পারলেই হবে না, উচ্চারণে আঞ্চলিকতা বড় সমস্যা। এ সমস্যা শিক্ষকদেরও।

ডিএফটির প্রথম সচিব অ্যাঞ্জেলা নোম্যান বলেন, পঠন দক্ষতা বৃদ্ধিতে শিক্ষা জীবনের শুরুতে বিনিয়োগ কম লাগে। পরবর্তী সময়ে এই কাজের জন্য বেশি ব্যয় করতে হয়। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ কয়েক গুণ বেশি হয়ে ফেরত আসে।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজাপালং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রীতি কণা দাস বলেন, ব্র্যাকের ইগরা প্রকল্পের কারণে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পঠনে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। এই প্রকল্প শিক্ষার মান উন্নয়নে ভালো ভূমিকা রেখেছে। যে শিশুরা আগে পড়তে পছন্দ করত না, তারা স্বাচ্ছন্দ্যে পাঠ্যবই পড়ছে। এই প্রকল্পের আওতায় গল্পের আসর, মজার খেলা, এক মিনিটে শব্দ বলাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ার বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দেশের সব প্রাথমিক স্কুলে ইগরা প্রকল্প চালু করা উচিত বলে জানান তিনি।

গোলটেবিলে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা আহ্‌ছানিয়া মিশনের এম এহছানুর রহমান, ডিএফআইডির টিম লিডার ফাহমিদা শবনম, ব্র্যাক এডুকেশন প্রোগ্রামের প্রজেক্ট ম্যানেজার সৈয়দা ফারিহা শাহিদা ইসলাম ও ইউনাইটেড পারপাসের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মাসুদ রানা।