যত্রতত্র ইটভাটায় হুমকিতে পরিবেশ

ময়মনসিংহ বিভাগ

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২০

মোস্তাফিজুর রহমান, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)

যত্রতত্র ইটভাটায় হুমকিতে পরিবেশ

ছবি: ফাইল

ইটভাটার পাশেই গুচ্ছগ্রাম। বসবাস করে শতাধিক পরিবার। রয়েছে বিল, হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবই। অথচ এসবের অন্তত এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না মর্মে আইনে উল্লেখ রয়েছে। কৃষিজমি, পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে তা ব্যবহার না করার শর্ত থাকলেও ময়মনসিংহে যত্রযত্র চলছে ইটভাটা। নবগঠিত বিভাগটিতে ৪৮৭টি ইটভাটার মধ্যে ২২০টির নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। আর এসব অবৈধ ইটভাটায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ময়মনসিংহ বিভাগে ইটভাটা রেেছ ৪৮৭টি। এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলায় ইটভাটা রয়েছে ৩০০টি। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে ১৭০টির। নেই ১৩০টি ইটভাটার। জামালপুর জেলার ৯৭টি ইটভাটার মধ্যে ছাড়পত্র রয়েছে ৫০টির। নেই ৪৭ ইটভাটার। নেত্রকোনা জেলার ৪৪টি ইটভাটার মধ্যে ৩৫টির ছাড়পত্র থাকলেও নেই ৯টি ভাটার। শেরপুরে ৪৬টি ইটভাটার মাত্র ১২টির ছাড়পত্র রয়েছে। বাকি ৩৪টি ইটভাটা চলছে পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়াই। পুরো বিভাগে ২৬৭টি ইটভাটার পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকলেও নেই ২২০টির। এ পরিসংখ্যানটি গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের। তবে বর্তমানে সংখ্যা আরও কিছু বৃদ্ধি পেলেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে সংরক্ষিত নেই।

আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি, কৃষিজমি, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, ডিগ্রেডেড এয়ার শেড এলাকার সীমানার অভ্যন্তরে কোনো ব্যক্তি ইটভাটা স্থাপন করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করার জন্য কৃষিজমি, পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি সংগ্রহ করে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। তবে জেলা প্রশাসকের অনুমোদনক্রমে ইট প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে মজা পুকুর, খালবিল, খাঁড়ি বা দিঘি, নদনদী, হাওর-বাঁওড়, চরাঞ্চল, পতিত জায়গা থেকে মাটি সংগ্রহ করতে পারবে। ইটভাটার লাইসেন্সের জন্য আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত ইটভটার মালিক কর্তৃক ইট প্রস্তুতের মাটির উৎস উল্লেখপূর্বক হলফনামা দাখিল করিতে হবে। ইটভাটা প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩-এ তা উল্লেখ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইটভাটাগুলো স্থাপন ও পরিচালনায় কোনো ধরনের বিধিমালা মানা হচ্ছে না। যত্রতত্র স্থাপন করা হচ্ছে ভাটা। কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ইটভাটার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন হয়ে পুকুর ও ডোবা হয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষিজমি হুমকির মুখে  পড়তে যাচ্ছে। ইটভাটায় কোনো ধরনের জ্বালানি কাঠ ব্যবহার না করার শর্ত থাকলেও দেদারছে ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের রামগোপালপুর বাজারের এক কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটার পাশেই রয়েছে গুচ্ছগ্রাম, বিল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাধন কুমার গুহ মজুমদার বলেন, ইটভাটা স্থাপনের জন্য তাদের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হয়। কিন্তু কোনো ইটভাটা তাদের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেয়নি। যত্রযত্র ইটভাটা স্থাপনের ফলে কৃষিজমির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ভাটায় ব্যবহার করায় জমিগুলোতে ফসলহানি ঘটেছে। বসতির পাশে ইটভাটা করায় জনজীবনেও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক সাবিকুন্নাহার বলেন, অধিকাংশ

ইটভাটা নিয়ম মেনে স্থাপন হচ্ছে না। ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করলেও নাকচ হয়ে যাচ্ছে। জনবল কম থাকায় যারা লাইসেন্স পাচ্ছে না, অথচ ইটভাটা চালাচ্ছে- তাদের বিষয়ে সঠিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

'জনউদ্যোগ' ময়মনসিংহের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু বলেন, জনজীবনের জন্য ইটভাটা হুমকিস্বরূপ। এ জন্য যারা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদের দায়িত্বে অবহেলা মানেই দেশটাকে অবহেলার চোখে দেখা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ফরিদ আহমেদ বলেন, সারাদেশের মতো ময়মনসিংহেও একই চিত্র। ছাড়পত্রের জন্য যেসব আবেদন পড়েছিল তার মধ্যে যেগুলো অবৈধ তার সবগুলোই বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। বাতিল করার পর ইটভাটা বন্ধ করার জন্য চিঠি দিয়ে সংশ্নিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনুমোদনবিহীন সব ইটভাটা ভাঙা কঠিন। তবে সব ভেঙে দিলে ইটেরও সংকট দেখা দিতে পারে।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, কৃষি বিভাগের অনাপত্তিপত্রসহ সব শর্ত পূরণ করে যারা আবেদন করে, তাদের অনুমোদন প্রদান করা হয়। অনুমোদনবিহীন ইটভাটাগুলোতে প্রতি বছর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অর্থদণ্ড ও ভাটা ধ্বংস করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এবারও বর্ষা মৌসুম শেষে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হবে।