প্রধানমন্ত্রী আজ উদ্বোধন করবেন

ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী পাবনার 'স্বাধীনতা চত্বর'

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২০     আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২০

এবিএম ফজলুর রহমান, পাবনা

মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সব শ্রেণির মানুষের সাহসী ভূমিকা চিরস্মরণীয়। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে রয়েছে এখানকার ছাত্র, যুবক ও শ্রমিকদের অনন্য অবদান। তারই সূতিকাগার ছিল জেলার ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দান। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এই টাউন হল প্রতিষ্ঠা হয়। এটি ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। অনেক বরেণ্য রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তির স্মৃতিতে ধন্য এই টাউন হল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অশ্বিনী কুমার দত্ত, এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রমুখ বড়মাপের নেতা ভাষণ দিয়েছেন এখানে আয়োজিত জনসভায়। ১৯০৮ সালে এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন, যেখানে সভাপতির আসন অলংকৃত করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ ছাড়া আব্বাস উদ্দীনসহ বহু শিল্পী এখানে গান গেয়েছেন। পরে পাবনা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এটিকে মুজিব বাহিনীর সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল মুক্তমঞ্চ নাম দেয়। সময়ের প্রয়োজনে এটিকে আরও আধুনিকায়নের দাবি ওঠে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নতুন প্রজন্ম টাউন হলকে আধুনিকায়ন করে 'স্বাধীনতা চত্বর' করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

যার প্রেক্ষাপটে পাবনা পৌরসভার সহায়তায় স্কয়ার গ্রুপের অন্যতম পরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জন চৌধুরী পিন্টুর নেতৃত্বে এটি বাস্তবায়ন করে স্বাধীনতা চত্বর বাস্তবায়ন কমিটি। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষের অর্থায়নে এটি নির্মাণ করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০ জুলাই মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিব বাহিনীর পাবনা অঞ্চলের অন্যতম সদস্য অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু ফলক উন্মোচন এবং এ চত্বরের নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। নির্মাণ কাজ চলতি বছরের মার্চে শেষ হয়। এটি নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ ঘটাবে বলে উদ্যোক্তারা আশা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই স্বাধীনতা চত্বরের উদ্বোধন করবেন।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, আধুনিকায়নের পর এটি হয় উত্তরবঙ্গ তথা দেশের মধ্যে অন্যতম স্বাধীনতা চত্বর। যেখানে প্রতিটি ইট-পাথরের নকশায় মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস বিদ্যমান। স্বাধীনতা চত্বরের প্রধান মঞ্চের দৈর্ঘ্য ৪৬ ফুট ও প্রস্থ ৪০ ফুট এবং উচ্চতা ২০ ফুট। যার দুই পাশে দুটি গ্রিনরুমসহ ওয়াশরুম রয়েছে। মাঠের দৈর্ঘ্য ১১৮ ফুট ও প্রস্থ ১১৭ ফুট। যার তিন দিকে দুই স্তরের বসার গ্যালারি রয়েছে। মাঠের উত্তর-পূর্ব কোণে প্রবেশের প্রধান ফটক এবং দক্ষিণ ও পূর্ব কোণে ছোট একটি গেট রয়েছে। এ ছাড়া সর্বপরি পুরো মাঠে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সবুজ ঘাস।

পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের ছাত্র মাশফিক মাহবুব সমকালকে বলেন, পাবনা টাউন হল আগে ছিল জরাজীর্ণ। এটি আধুনিকায়ন হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধ নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে যাবে।

পাবনা নাগরিক সমাজের সভাপতি আব্দুল মতীন খান বলেন, সময়ের প্রয়োজনে এটি আধুনিকায়ন জরুরি হয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতা চত্বর আরও বড় পরিসরে পাবনার মানুষকে দেশের মধ্যে পরিচিত করবে।

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহসভাপতি আলী মর্তুজা বিশ্বাস সনি বলেন, স্বাধীনতা চত্বরের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আরও জানতে পারবে।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনার মানুষ সর্ব প্রথম পাকহানাদারকে প্রতিহত করে। তাই স্বাধীনতা চত্বর এ জেলাকে নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেবে। পাবনা পৌরসভার মেয়র কামরুল হাসান মিন্টু বলেন, স্বাধীনতা চত্বর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম জেলার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারবে।

স্বাধীনতা চত্বর বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নেই সারাদেশের মধ্যে পাবনা প্রথম হানাদার মুক্ত হয়। এখানেই এ জেলার প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের এ চেতনা লালন করেই এ চত্বরে নির্মাণ শুরু হয় একটি অত্যাধুনিক বিশাল মঞ্চ। অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু আরও বলেন, সরকারের সহায়তা ছাড়াই স্থানীয় উদ্যোগে এত বড় একটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন সমাজে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা জন্ম নেবে।