চট্টগ্রাম-সেন্টমার্টিন রুটে বিলাসবহুল প্রমোদতরী

যাত্রা শুরু বে ওয়ান ক্রুজের

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২১

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম-সেন্টমার্টিন রুটে বিলাসবহুল প্রমোদতরী

বিলাসবহুল জাহাজ বে ওয়ান ক্রুজ। বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে সরাসরি সেন্টমার্টিন দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করে জাহাজটি - সমকাল

পর্যটনে নতুন সুখবর নিয়ে এলো বিলাসবহুল জাহাজ 'বে ওয়ান ক্রুজ'। জাপান থেকে আনা অত্যাধুনিক এ জাহাজটি প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি যাবে প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে। দুই হাজার যাত্রী ধারণ ক্ষমতার জাহাজটির ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৪ নটিক্যাল মাইল বেগে চলার সক্ষমতা রয়েছে।

এ জাহাজে আছে প্রেসিডেন্ট স্যুট, বাঙ্কার বেড কেবিন, টুইন বেড কেবিনসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির কক্ষ। আছে একটি অভিজাত রেস্তোরাঁ ও স্বয়ংক্রিয় ভেন্ডিং মেশিন। যাত্রীদের সেবায় এই জাহাজে থাকবেন ১৬৭ ক্রু।

সপ্তাহে তিন দিন 'বে ওয়ান ক্রুজ' পতেঙ্গা ওয়াটার বাস টার্মিনাল থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। সর্বনিম্ন দুই হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ভাড়ায় যে কেউ এই প্রমোদতরীতে ভ্রমণ করতে পারবেন। ইচ্ছা হলে জাহাজে কাটানো যাবে রাতও। বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা শুরু করে শুক্রবার সকাল ৮টায় এটি সেন্টমার্টিনে নোঙর করে।

সমুদ্রযাত্রায় বাংলাদেশে এমন বিলাসবহুল প্রমোদতরী এটিই প্রথম বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ রশিদ। তিনি বলেন, 'বে ওয়ান ক্রুজ জাহাজের দু'পাশে দুটি পাখা আছে। সাগরে তিন-চার নম্বর সতর্ক সংকেত থাকলেও এটির কোনো সমস্যা হবে না। পৃথিবীর সব দেশে এ জাহাজটি চলাচল করতে পারবে। দুই হাজার যাত্রী নিয়ে এটি বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবেও যেতে পারবে। এতে সাড়ে ১১ হাজার হর্সপাওয়ারের দুটি ইঞ্জিন আছে। তিন মেগাওয়াটের তিনটি জেনারেটর আছে। জাহাজটিতে ওয়েস্ট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট আছে। এই জাহাজের কোনো বর্জ্য সরাসরি সাগরে পড়বে না।

এটি যেমন নিরাপদ, তেমনি আরামদায়ক নৌযান। এর দৈর্ঘ্য ৩৯৩ ফুট, প্রস্থ ৫৫ ফুট, গভীরতা ১৮ ফুট।'

উদ্যোক্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতি, শুক্রবার ও শনিবার রাত ১১টায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ওয়াটার বাস টার্মিনাল থেকে ছাড়বে জাহাজটি। সেটি সেন্টমার্টিন পৌঁছাবে সকাল ৮টায়। আবার সেন্টমার্টিন থেকে শুক্রবার, শনিবার ও রোববার দুপুর ১টায় ফিরতি যাত্রী নিয়ে জাহাজটি সেন্টমার্টিন থেকে ছাড়বে। সন্ধ্যা ৭টায় এটি চট্টগ্রামে নোঙর করবে। নগরীর পতেঙ্গায় ওয়াটার বাস টার্মিনাল থেকেই সপ্তাহে তিন দিন সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা দেবে জাহাজটি। তবে গভীরতা বেশি হওয়ায় এ জাহাজটি সরাসরি সেন্ট মার্টিনে নোঙর করতে পারছে না। তাই সেন্টমার্টিনগামী যাত্রীদের উপকূলের প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে আরেকটি ছোট জাহাজে উঠতে হবে।

তবে এ জাহাজটি ২৮ বছরের পুরোনো। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ২৫ বছরের পুরোনো জাহাজ সাগরে ভাসানোর ওপর নিষেধ আছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এম এ রশিদ বলেন, 'এই আইন শুধু আমাদের দেশে আছে। এটিকে যুগোপযোগী করতে আবেদন করেছি আমরা। কারণ বিদেশে প্যাসেঞ্জার জাহাজ ৫৫-৬০ বছরের পুরোনো হলেও চলে।'

কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স যাত্রা শুরু করে ১৯৯৪ সালে। প্রথমে বন্দরের জন্য পাঁচটি টাগবোট তৈরি করে তারা। এরপর বড় বড় জাহাজ তৈরি ও সংস্কারে মনোনিবেশ করে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের 'বাংলার সৌরভ' জাহাজ মেরামত করে এ প্রতিষ্ঠান। পৌনে ২৯ কোটি টাকা জরিমানার ঝুঁকি নিয়ে জাহাজটির ১৫০ ফুট ফেলে দিয়ে নতুনভাবে এটি তৈরি করে সুনাম কুড়িয়েছেন তারা। ১৬ হাজার টনের সেই জাহাজটি এখনও সচল রয়েছে।

কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, তারা এ পর্যন্ত প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ড্রেজার নির্মাণ করেছেন বাংলাদেশে। এ পর্যন্ত এক হাজার ২০০ জাহাজ তৈরি করেছেন তারা। সংস্কার করেছেন সাত-আটশ' জাহাজ। তাদের তৈরি 'কর্ণফুলী এক্সপ্রেস' নামের আরেকটি বিলাসবহুল জাহাজ গত বছর জানুয়ারি থেকে চলছে কক্সবাজার-টেকনাফ রুটে।

কোন প্যাকেজে কত খরচ :'এমারেল্ড ক্ল্যাসিক' নামের প্যাকেজটিতে ভাড়া নির্ধারিত হয়েছে আসা-যাওয়া ও রাতযাপন খরচসহ। এখানে আছে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট এবং ডিনার। ভিভিআইপি প্যাকেজের আওতায় দু'জনের ভিভিআইপি কেবিনের ভাড়া পড়বে ৫০ হাজার টাকা। ফ্যামিলি প্যাকেজের আওতায় চারজনের স্পেশাল ক্লাস বাঙ্কারের ভাড়া পড়বে ৫০ হাজার টাকা। রয়েল প্যাকেজের আওতায় দু'জনের রয়্যাল স্যুটের ভাড়া পড়বে ৪৫ হাজার টাকা। প্রেসিডেন্সিয়াল প্যাকেজের আওতায় দু'জনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটের ভাড়া পড়বে ৩০ হাজার টাকা। বাঙ্কার বেড প্যাকেজের আওতায় একজনের বাঙ্কার বেডের ভাড়া পড়বে ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ইকোনমি প্যাকেজের আওতায় ইকোনমি সিটের ভাড়া পড়বে তিন হাজার টাকা, অন্যদিকে বিজনেস ক্লাস সিটের ভাড়া চার হাজার টাকা। তবে এই প্যাকেজে আছে শুধুই কমপ্লিমেন্টারি স্ন্যাকস।

'ওশানস হ্যাভেন' নামের পৃথক আরেকটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে একমুখী ভাড়া ও রাতযাপনসহ। এখানে থাকছে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট। ভিভিআইপি কেবিনে দু'জনের ভাড়া পড়বে ২৫ হাজার টাকা। ফ্যামিলি প্যাকেজে স্পেশাল ফার্স্ট ক্লাস বাঙ্কার বেডের ভাড়া হবে ২৫ হাজার টাকা। রয়েল প্যাকেজে দু'জনের রয়্যাল স্যুটের ভাড়া পড়বে ২০ হাজার টাকা। তবে প্রেসিডেন্সিয়াল প্যাকেজের আওতায় দু'জনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটের ভাড়া পড়বে ১৫ হাজার টাকা। একজনের সিঙ্গেল বাঙ্কার বেডের ভাড়া সাত হাজার টাকা।

'এমারেল্ড ক্ল্যাসিক' নামের আরেকটি প্যাকেজে শুধু একমুখী ভাড়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই প্যাকেজের আওতায় ভিভিআইপি কেবিনের ভাড়া ৩০ হাজার টাকা, ফ্যামিলি কেবিনের ভাড়া ৩০ হাজার টাকা। রয়্যাল স্যুটের ভাড়া ২৫ হাজার টাকা। প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটের ভাড়া ২০ হাজার টাকা। সিঙ্গেল বাঙ্কার বেডের ভাড়া ছয় হাজার টাকা। বিজনেস ক্লাস সিটের ভাড়া দুই হাজার ৫০০ টাকা। আর ইকোনমি সিটের ভাড়া দুই হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।