'মরণফাঁদ' অবৈধ ক্রসিং

কুমিল্লায় দুই শতাধিক অনুমোদনহীন রেলক্রসিং

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২১

কুমিল্লা সংবাদদাতা

'মরণফাঁদ' অবৈধ ক্রসিং

কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশনের অদূরে মিশ্রী-পাইকপাড়া সড়কের অরক্ষিত রেলক্রসিং সমকাল

কুমিল্লায় রেলপথে থাকা ক্রসিংগুলোর বেশিরভাগই অনুমোদনহীন। এসব অবৈধ রেলক্রসিং মানুষের জন্য 'মরণফাঁদ' হিসেবে দেখা দিয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনুমোদনহীন এমন রেলক্রসিং রয়েছে দুই শতাধিক। যদিও স্থানীয় সূত্রের দাবি, এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য নেই রেলওয়ের কাছেও।

অবৈধ এসব রেলক্রসিংয়ে প্রায়ই ঘটছে প্রাণহানি। এর পরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে মানুষকে। এসব রেলক্রসিংয়ে গেট নির্মাণ ও গেটম্যান নিয়োগের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও এ সমস্যা সমাধানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তেমন উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে চলমান থাকা কুমিল্লার লাকসাম থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পর্যন্ত ডাবল লাইন প্রকল্পের আওতায় অবৈধ ১৫টি রেলক্রসিংয়ে গেট নির্মাণ ও গেটম্যান নিয়োগের কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশনের আওতাধীন রেলপথ এলাকার পরিমাণ প্রায় ১৮৪ কিলোমিটার। ঢাকা-লাকসাম-চট্টগ্রাম, লাকসাম-নোয়াখালী ও লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের মধ্যে থাকা এই বিশাল এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশ। এই রেলপথের মধ্যে থাকা হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ রেলক্রসিং অনুমোদনহীন এবং অবৈধ। গত কয়েক বছরের মধ্যে এসব ক্রসিংয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অনেক বৈধ ক্রসিংয়ের ত্রুটিপূর্ণ ব্যারিয়ারের কারণেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। ক্রসিংয়ে দুই পাশে দুটি ব্যারিয়ার থাকায় রংসাইড দিয়ে গাড়ি প্রবেশ করছে। এতেও ঘটছে দুর্ঘটনা। গত ৩০ ডিসেম্বর কুমিল্লা নগরীর শাসনগাছা এলাকায় রেলক্রসিংয়ে রংসাইড দিয়ে প্রবেশ করে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এতে

অটোরিকশার যাত্রী স্বামী-স্ত্রী ঘটনার দিন এবং তাদের কলেজপড়ূয়া মেয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচ দিন পর মারা যান।

জানতে চাইলে লাকসাম রেলওয়ে থানার ওসি নাজিম উদ্দিন বলেন, বিশাল এই এলাকায় কতগুলো রেলক্রসিং রয়েছে, এর সঠিক তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে বেশিরভাগ রেলক্রসিংই অনুমোদনহীন। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম রেলওয়ে থানার আওতাধীন ওই রেলপথ এলাকার মধ্যে ১১৭টি ক্রসিংয়ের হিসাব রয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৪টি ক্রসিং বৈধ। বৈধ ওই ৩৪টির কয়েকটিতে নেই গেট ও গেটম্যান। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এসব স্থানে নিজ দায়িত্বে পারাপারের জন্য সতর্কবার্তা লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। অরক্ষিত এসব রেলক্রসিংয়ে সতর্কবার্তা দিলেও থামছে না দুর্ঘটনা।

জেলার লালমাই উপজেলার বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি রেললাইনের ক্রসিং সংলগ্ন জমি অবৈধভাবে দখল করে বাড়িঘর, দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে। যে কারণে অনেক সময় পথচারী ও যানবাহন চালকদের ট্রেন চলাচল চোখে পড়ে না। এতে প্রতিটি অবৈধ রেলক্রসিং মরণফাঁদ হয়ে পড়েছে। অনেক মানুষ নিজেদের ভুলেই ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ দিচ্ছে।

রেলওয়ে কুমিল্লার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ বিভাগ) লিয়াকত আলী মজুমদার জানান, আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত মোট ৭১টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ৫৮টি অবৈধ এবং ১৩টি বৈধ ক্রসিংয়ে রেলওয়ের গেটম্যান রয়েছেন। ডাবল লাইন প্রকল্পের আওতায় আরও ১৫টি অবৈধ রেলক্রসিংয়ে জনবল নিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া আগের ক্রসিংয়ে দুই পাশে দুটি ব্যারিয়ার দেওয়া হতো। নতুনগুলোতে দুই পাশে দুটি করে চারটি ব্যারিয়ার দেওয়া হবে। এর ফলে যানবাহন রংসাইড দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।

জেলার নাঙ্গলকোটের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের লাকসাম থেকে চিনকি আস্তানা পর্যন্ত ডাবল লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু করেছে। ৬১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ ক্রসিংয়ে কোনো গেট ও গেটম্যান নেই। এতে প্রায়ই ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। দ্রুত এসব বিষয়ে রেলওয়েকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

লাকসাম রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, লাকসাম রেলওয়ের আওতাধীন ১৮৪ কিলোমিটার এলাকায় গত ৩ বছরে শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অনেক সময় দেখা যায়, দুর্ঘটনা বা হতাহতের খবরও রেলওয়ে পুলিশের কাছে এসে পৌঁছে না। স্থানীয়রা নিজেরাই লাশ উদ্ধার করে দাফন করে ফেলেন। আর এসব প্রাণহানির বেশিরভাগই হয়েছে অবৈধ রেলক্রসিংয়ের কারণে।

জানতে চাইলে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীন সমকালকে বলেন, লাকসাম থেকে আখাউড়া ডাবল লাইন প্রকল্পে বেশ কয়েকটি স্থানে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সব রেলক্রসিংয়ে গেট নির্মাণ এবং গেটম্যান নিয়োগ দেব। এখন মানুষকে সচেতন হয়ে চলাচল করতে হবে।