করোনায় প্রতিবন্ধীরা চরম স্বাস্থ্য ও আর্থিক ঝুঁকিতে

পৃথক মন্ত্রণালয় এখন সময়ের দাবি

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২১

সাজিদা ইসলাম পারুল

করোনায় প্রতিবন্ধীরা চরম স্বাস্থ্য ও আর্থিক ঝুঁকিতে

প্রতীকী ছবি

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারিতে গত বছরের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে দেড় শতাধিক প্রতিবন্ধী নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ জন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার, অন্যরা ধর্ষণের। করোনাকালে প্রতিবন্ধী এক নারীকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রাস্তায় বসে থাকা তার ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। সম্পত্তির জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে খুন পর্যন্ত করা হয়েছে। অনেক গার্মেন্ট থেকে প্রতিবন্ধী নারীদের ছাঁটাই করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে চরমভাবে ব্যাহত হয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সব ধরনের অধিকার।

মানবাধিকারকর্মীরা জানান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান হারানোসহ সব মৌলিক অধিকার আদায়ে পিছিয়ে পড়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও আর্থিক দিক দিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তারা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রতিবন্ধীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করলেও কভিড-১৯-এর মহামারির সময় তা শুধু কিছু অর্থ সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে এ সময় তাদের অধিকার আদায় এবং মূলধারায় সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা গতি হারায়। তাদের মতে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনেক কাজ থাকায় আলাদা করে প্রতিবন্ধীদের বিষয়টি গুরুত্ব হারাচ্ছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে ২১ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেশে মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ বা ১ কোটি ৬০ লাখ প্রতিবন্ধী রয়েছেন। তাই এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।

গত বছরের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে দেড় শতাধিক প্রতিবন্ধী নারী নির্যাতনের শিকার হন বলে জানান উইমেন উইথ ডিজএবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশ্রাফুন নাহার মিষ্টি। তিনি বলেন, বেশিরভাগ নারীকে ত্রাণ দেওয়ার প্রলোভনে ধর্ষণ করা হয়। এ তথ্য গণমাধ্যমের। প্রকৃত ঘটনা অনেক বেশি। কারণ সব ঘটনা গণমাধ্যমে আসে না। প্রতিবন্ধী নারীকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া, সম্পত্তির জন্য খুন করার মতো অমানবিক কাজও এ সময় ঘটেছে। আড়াই হাজার টাকার প্যাকেজও পাননি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। তিনি বলেন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তৎপরতায় কিছু প্রতিবন্ধী নারী গার্মেন্টে কাজ পান। গার্মেন্ট চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা কর্মক্ষেত্রে পৌঁছাতে না পারায় অনেকেই ঝরে পড়েন। তাদের অনেককে শুরুতেই ছাঁটাই করা হয়।

'প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা-২০০৯' প্রণয়ন করেছে সরকার। বর্তমানে এ নীতিমালায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সারাদেশে ৫৬টি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুল আছে। এ কার্যক্রমটি জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন বাস্তবায়ন করে থাকে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য পাঁচটি স্কুল আছে। ৬৪ জেলায় আছে ৬৪টি সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত স্কুুলও। এত কিছুর পরও লকডাউনের সময় যখন স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষা গ্রহণ শুরু হয়, তখন সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে মন্তব্য করেন ইউনেস্কো লরিয়েট এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ইপ্‌সার কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ভাস্কর ভট্টাচার্য।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা করোনার কারণে সাধারণ চিকিৎসাসেবা পেতে সমস্যার সম্মুখীন হন বলেছেন অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আলবার্ট মোল্লা। তিনি বলেন, বিশেষ চিকিৎসা যেমন- থেরাপি সেবাও নিতে পারছেন না। করোনাবিষয়ক সেবা দিতে যে হটলাইন চালু রয়েছে, তা সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিতে পারছেন না। আবার দৃষ্টি ও গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তি একজন সহযোগী সঙ্গে রাখার অনুমতি না পাওয়ায় হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা নিতে পারছেন না। সরকার বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য করোনা পরীক্ষার নমুনা বাড়ি থেকে সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছে। গুরুতর প্রতিবন্ধীদের জন্যও এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

আলবার্ট মোল্লা উল্লেখ করেন, সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ঢাকা ও চট্টগ্রামে করা এক জরিপে দেখা যায়, করোনার কারণে ৬৮ শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। যার একটা বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এ খাতে অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন। আবার প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ছাঁটাইয়ের প্রশ্ন এলে আগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে ছাঁটাই করা হয়। বিগত কয়েক বছরে প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা আবার পিছিয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আমাদের কাছে খবর আছে ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকেই পুঁজির অভাবে ব্যবসা বন্ধ করেছেন। প্রতিবন্ধী কার্ড না থাকায় সরকারের কভিড-১৯ সহায়তায় তাদের বিবেচনা করা হয়নি। বিশেষ করে করোনাকালে সরকারি সুযোগ-সুবিধা যেমন- খাদ্য সহায়তা ও আর্থিক সহায়তা না পাওয়া, প্রতিবন্ধী ভাতা পেলে অন্য কোনো সহায়তা না পাওয়া, কভিড-১৯-সংক্রান্ত সরকারি সব তথ্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জানতে না পারা- এমন অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং সর্বোপরি বাজেটে অপর্যাপ্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

চাকরিপ্রত্যাশী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী গ্র্যাজুয়েট পরিষদের আহ্বায়ক আলী হোসেন বলেন, ছয়টি দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন করে আসছি। প্রধানমন্ত্রী ২০১৯ সালের ৯ অক্টোবর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমানের সার্বিক উন্নয়নে দ্রুত কর্মক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, যা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। করোনাকালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জীবিকা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা কিছুই পাইনি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় 'উন্নয়ন অধিদপ্তর' করার দাবি জানান তিনি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ে অভিজ্ঞজনেরা বলেন, ২০১৯ সালে বর্তমান সরকার নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় এলে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন পায়। কিন্তু দুই বছরেও এর বাস্তবায়ন নেই।